প্রায় ছয় দশক আগে উদ্ভাবিত উল্লম্বভাবে উড্ডয়ন ও অবতরণে সক্ষম জাইরোকপ্টার প্রযুক্তি আবারও আলোচনায় ফিরে এসেছে। আধুনিক হেলিকপ্টারের তুলনায় কম খরচে এবং পরিবেশের ওপর কম প্রভাব ফেলে—এমন একটি বিকল্প সমাধান হিসেবে এটিকে সামনে আনছে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরে।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এআরসি অ্যারোসিস্টেমের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. সাইয়েদ মোহসেনি জানান, উন্নত এয়ার মোবিলিটির জন্য দীর্ঘদিন ধরেই কার্যকর ও বাস্তবসম্মত সমাধান খোঁজা হচ্ছিল। তাঁর ভাষায়, এটি কোনো নতুন ধারণা নয়, বরং অতীতে ব্যবহৃত একটি কার্যকর প্রযুক্তি, যা সময়ের সঙ্গে হারিয়ে গিয়েছিল।
১৯৬০-এর দশকে কানাডীয় বিমান নির্মাতা অ্যাভ্রো কানাডার সাবেক কয়েকজন প্রকৌশলী ‘অ্যাভিয়ান ২/১৮০’ নামে একটি বিশেষ জাইরোপ্লেন তৈরি করেন। মূলত ১৯২০-এর দশকে আত্মপ্রকাশ করা জাইরোপ্লেন বা অটোজাইরো এমন একটি উড়োজাহাজ, যেখানে ওপরের রটর বাতাসের প্রবাহে ঘুরে লিফট তৈরি করে এবং পেছনের প্রপেলার সামনের দিকে ঠেলে নেয়। হেলিকপ্টারের মতো রটর ইঞ্জিনচালিত না হওয়ায়, ইঞ্জিন বন্ধ হলেও বাতাসের সাহায্যে রটর ঘুরতে থাকে এবং উড়োজাহাজটি নিরাপদে ধীরে নিচে নামতে পারে।
সাধারণ জাইরোপ্লেন চালাতে রানওয়ে প্রয়োজন হলেও অ্যাভিয়ান ২/১৮০ বিশেষ ‘হপিং’ কৌশলে উল্লম্বভাবে আকাশে উঠতে সক্ষম ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফএএ) থেকে উড্ডয়ন অনুমোদন পেলেও এটি কখনো বাণিজ্যিক উৎপাদনে যায়নি। ১৯৭০-এর দশকে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে গেলে নকশাটিও হারিয়ে যায়।
এআরসি অ্যারোসিস্টেম সেই পুরোনো নকশাকে আধুনিক প্রযুক্তিতে রূপান্তর করে তৈরি করছে নতুন জাইরোপ্লেন ‘পেগাসাস’। এটি উল্লম্বভাবে উড্ডয়ন ও অবতরণ করতে পারে, ফলে বিদ্যমান হেলিপ্যাড ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে। উড়োজাহাজটিতে স্বয়ংক্রিয় চার্জিং সুবিধাসহ একটি হাইব্রিড-ইলেকট্রিক ইঞ্জিন রয়েছে, যা পেছনের প্রপেলার চালায়। ড. মোহসেনির মতে, রটর ইঞ্জিনচালিত না হওয়ায় এতে গিয়ারবক্সের প্রয়োজন নেই, ফলে রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
পেগাসাসে একজন পাইলটসহ মোট দুইজন যাত্রী বহন করা যাবে। এর সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় প্রায় ১৬০ কিলোমিটার, যা সাধারণ হেলিকপ্টারের তুলনায় কম হলেও জরুরি চিকিৎসা সেবা সহ বিভিন্ন কাজে এটি কার্যকর বিকল্প হতে পারে বলে দাবি করেন মোহসেনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই জাইরোপ্লেন হেলিকপ্টারের মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়া প্রায় ৯০ শতাংশ এয়ার অ্যাম্বুলেন্স মিশন পরিচালনা করতে সক্ষম।
যুক্তরাজ্যে হেলিকপ্টার দিয়ে একটি জরুরি চিকিৎসা মিশনের গড় খরচ যেখানে প্রায় ৪ হাজার ১৬৫ পাউন্ড, সেখানে পেগাসাসের ঘণ্টাপ্রতি পরিচালন ব্যয় আনুমানিক ৩০০ ডলার বলে জানান তিনি। তবে এই হিসাবের মধ্যে পাইলট ও চিকিৎসাকর্মীদের পারিশ্রমিক অন্তর্ভুক্ত নয়। উড়োজাহাজটির সম্ভাব্য বাজারমূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার পাউন্ড।
গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ের এরোস্পেস বিজ্ঞানের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক ড. ডগলাস থমসন বলেন, হেলিকপ্টার জ্বালানি ব্যবহারে তুলনামূলকভাবে অদক্ষ এবং যান্ত্রিক দিক থেকে বেশ জটিল। অন্যদিকে অটোজাইরোর গঠন অনেক সহজ, যা একে নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য করে তোলে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, বড় আকারের কিংবা বেশি যাত্রী বহনের ক্ষেত্রে জাইরোপ্লেনের ব্যবহার সীমিত হতে পারে।
পেগাসাস পরিচালনায় বিশেষ দক্ষতা প্রয়োজন স্বীকার করে ড. মোহসেনি বলেন, এটি হেলিকপ্টারের চেয়ে বেশি কঠিন নয়। পাইলটদের রটরক্রাফটের বাণিজ্যিক লাইসেন্স ও নির্দিষ্ট টাইপ রেটিং থাকতে হবে, যা প্রতিষ্ঠান নিজস্ব প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নিশ্চিত করবে।
ইতোমধ্যে পেগাসাস যুক্তরাজ্যের সিভিল এভিয়েশন অথরিটি (সিএএ) থেকে ‘ই কন্ডিশনস’ সনদ পেয়েছে, যার ফলে পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন শুরু করা সম্ভব হয়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি অথবা মার্চে প্রথম টেস্ট ফ্লাইট পরিচালনার আশা করছেন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান।
এ পর্যন্ত এআরসি অ্যারোসিস্টেম বেসরকারি বিনিয়োগকারী ও যুক্তরাজ্য সরকারের কাছ থেকে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ পাউন্ড অর্থায়ন পেয়েছে। তবে পূর্ণাঙ্গভাবে বাজারে আনতে আরও আনুমানিক ২ কোটি ৫০ লাখ পাউন্ড বিনিয়োগ প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন মোহসেনি। অর্থায়ন নিশ্চিত হলে তিন বছরের মধ্যেই বাণিজ্যিকভাবে পেগাসাস পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ইতোমধ্যে নরউইচভিত্তিক স্কাইঅ্যাঞ্জেলস এয়ার অ্যাম্বুলেন্স ১০টি পেগাসাস কেনার অর্ডার দিয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের কিডনি পরিবহন সংস্থা ‘৩৪লাইভস’ সর্বোচ্চ ৩০টি জাইরোপ্লেন নেওয়ার চুক্তি করেছে। ভবিষ্যতে নজরদারি, এয়ার ট্যাক্সি ও অন্যান্য বিশেষায়িত কাজে পেগাসাস ব্যবহারের পরিকল্পনাও রয়েছে। একই সঙ্গে ৯ যাত্রী বহনে সক্ষম বড় আকারের জাইরোপ্লেন ‘লিংক্স পি৯’ তৈরির কাজ চলছে, যা ২০৩০ সালের মধ্যে বাজারে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


