মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি : মানিকগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোহাম্মদ আলী ও একটি শিল্প গ্রুপের পরিচালক আকিবুল হাসান খানের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, বালুমহাল ইজারায় অনিয়ম এবং অবৈধ বালু উত্তোলনে সহযোগিতার অভিযোগ এনে জেলা প্রশাসকের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও অভিযোগের পক্ষে কোনো নির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি। পরে অভিযোগকারী নিজেই অভিযোগটি প্রত্যাহার করেছেন বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।

গত মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) হরিরামপুর উপজেলা যুবদলের নেতা মো. রাকিব মোল্লা চার শতাধিক ব্যক্তির গণস্বাক্ষরসংবলিত একটি অভিযোগপত্র জেলা প্রশাসকের কাছে জমা দেন। অভিযোগের সঙ্গে বালুমহাল-সংক্রান্ত কয়েকটি পুরোনো সংবাদ প্রতিবেদনও সংযুক্ত করা হয়। তবে ওই প্রতিবেদনে শক্তিশালী সিন্ডিকেট ও রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগের উল্লেখ থাকলেও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক বা অন্য কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ বা অবৈধ লেনদেনের কোনো তথ্য-প্রমাণ ছিল না।
অভিযোগে দাবি করা হয়, হরিরামপুর উপজেলার ধূলশুরা ও আজিমনগর ইউনিয়নে পদ্মা নদীর ভাঙনের সুযোগ নিয়ে লেছড়াগঞ্জ বালুমহালের ইজারাদার নির্ধারিত সীমানার বাইরে থেকে বালু উত্তোলন করছেন এবং এতে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোহাম্মদ আলী সহযোগিতা করছেন। আরও অভিযোগ করা হয়, চলতি বছরের বালুমহালের ইজারা পাইয়ে দিতে এক কোটি টাকা ঘুষ নেওয়া হয়েছে এবং ব্যবসায়ী আকিবুল হাসান খান ইজারা প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করেছেন।
এ ছাড়া অভিযোগে বলা হয়, রাহাতপুর বালুমহাল এলাকায় অরাজকতা সৃষ্টি এবং উচ্চ আদালতে রিট করে ইজারা কার্যক্রম বন্ধের পেছনেও সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা রয়েছে। অভিযোগে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে প্রত্যাহার, তদন্ত এবং অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধের দাবি জানানো হয়। অন্যথায় গণআন্দোলনেরও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।
অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে অভিযোগকারী রাকিব মোল্লার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করেন এই প্রতিবেদক। অভিযোগের পক্ষে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ চাইলে তিনি কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেননি। বরং পূর্বে প্রকাশিত কয়েকটি সংবাদ প্রতিবেদনকে রেফারেন্স হিসেবে উল্লেখ করেন।
একপর্যায়ে তিনি স্বীকার করেন, অভিযোগের বিষয়ে তার কাছে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য-প্রমাণ নেই। পরে এ বিষয়ে আরও জানতে চাইলে তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
অভিযোগপত্রে থাকা গণস্বাক্ষরকারীদের মধ্যে অন্তত ২০ জনের সঙ্গে কথা বলে ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়।
তালিকায় নাম থাকা মালেক বেপারী জানান, তিনি সিলেট জেলার বাসিন্দা। মো. মনসুর আলীর মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
তারেক হোসেন বলেন, তিনি চালা ইউনিয়নের দিয়াবাড়ি এলাকার বাসিন্দা। পদ্মা নদীতে বালু উত্তোলনের কারণে ভাঙন হচ্ছে বলে শুনেছেন, তবে বালুমহালের নির্ধারিত সীমানার বাইরে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে কি না বা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ঘুষ নিয়েছেন কি না—এ বিষয়ে তার কোনো জানা নেই।
তালিকায় থাকা সোহরাব নামে আরেক ব্যক্তি বলেন, তার বাড়ি রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নে। বর্তমানে তিনি ঢাকায় প্রিন্টিংয়ের কাজ করেন। তিনি শুনেছেন নদীতে বালু উত্তোলনের কারণে ভাঙন হচ্ছে, তবে কারা কোথা থেকে বালু উত্তোলন করছে, সে বিষয়ে কিছু জানেন না।
লাল বরু বেগম বলেন, তিনি কোনো কাগজে স্বাক্ষর করেননি। গত দুই মাস তিনি বাড়িতে ছিলেন না। তার নাম ব্যবহার করে কে স্বাক্ষর করেছে, সেটিও তিনি জানেন না।
রিপন হালদার বলেন, তারা নদীভাঙন এলাকার বাসিন্দা। সাহায্য ও অনুদানের কথা বলে দুই ব্যক্তি এসে তাদের স্বাক্ষর নিয়েছিলেন।
হরিরামপুরের একাধিক রাজনৈতিক ব্যক্তির দাবি, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই স্থানীয় এক যুবদল নেতাকে দিয়ে এ অভিযোগ করানো হয়েছে।
অভিযোগে নাম আসা ব্যবসায়ী আকিবুল হাসান খান বলেন, “আমি ব্যবসার কাজে বেশিরভাগ সময় ঢাকা ও ময়মনসিংহে থাকি। আমাদের পরিবারের সুনাম ক্ষুণ্ন করতেই একটি মহল অপপ্রচার চালাচ্ছে। লেছড়াগঞ্জ বালুমহালের ইজারা আমাদের এক আত্মীয় পেয়েছেন। যতদূর জানি, প্রশাসনের নির্ধারিত সীমানার মধ্যেই বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।”
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোহাম্মদ আলী বলেন, “ঘুষ বা অবৈধ অর্থ লেনদেনের কোনো ঘটনা ঘটেনি। আইন মেনেই বালুমহালের ইজারা দেওয়া হয়েছে। অবৈধ সুবিধা আদায় করতে না পেরে একটি চক্র আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করেছে। অভিযোগকারী রাকিব মোল্লা লিখিতভাবে অভিযোগ প্রত্যাহার করেছেন।”
জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা বলেন, “এক ব্যক্তি অভিযোগ করেছিলেন। পরে তিনি সেটি প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। এছাড়া বালুমহালের সীমানার বাইরে বালু উত্তোলন হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে প্রশাসনের নিয়মিত নজরদারি রয়েছে।”
অভিযোগকারী রাকিব মোল্লা বৃহস্পতিবার দুপুরে অভিযোগ প্রত্যাহারের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, “ঘুষ লেনদেনের বিষয়টি কয়েকজনের মুখে শুনে অভিযোগ করেছিলাম। তবে এ অভিযোগের পক্ষে আমার কাছে কোনো তথ্য-প্রমাণ নেই। পরে বুঝতে পেরেছি, সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া এ ধরনের অভিযোগ করা ঠিক হয়নি। তাই অভিযোগটি প্রত্যাহার করে নিয়েছি।”
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।



