যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে দক্ষিণ ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইউএসএফ) দুই বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থীকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় চাঞ্চল্যকর সব তথ্য প্রকাশ করেছেন মার্কিন প্রসিকিউটররা। তদন্তে উঠে এসেছে সন্দেহভাজনের দেওয়া পরস্পরবিরোধী বয়ান এবং হত্যাকাণ্ডের সময়কার একটি বিস্তারিত টাইমলাইন। খবর সিএনএনের।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গতকাল রোববার হিলসবোরো কাউন্টি আদালতে প্রসিকিউটরদের দাখিল করা একটি প্রি-ট্রায়াল ডিটেনশন মোশন থেকে জানা গেছে, খুনের ধরন এতটাই বীভৎস ছিল যে অভিযুক্ত হিশাম আবুঘারবিয়েহকে (২৬) জামিন দিলে তা সমাজের জন্য চরম বিপদের কারণ হতে পারে।
আদালতের নথি অনুযায়ী, নিহত জামিল লিমন (২৭) যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার পিএইচডি শিক্ষার্থী ছিলেন। তার মরদেহ হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজে পাওয়া যায়। ময়নাতদন্তে বলা হয়েছে, তিনি একাধিক ধারালো অস্ত্রের আঘাতে নিহত হয়েছেন।
এই ঘটনায় লিমনের রুমমেট হিশাম আবুঘারবিয়েহ-এর বিরুদ্ধে লিমন ও তার বন্ধু নাহিদা বৃষ্টি (২৭)-কে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে।
তদন্তকারীদের তথ্যমতে, গত ১৬ এপ্রিল থেকে নিখোঁজ হওয়ার পর হাওয়ার্ড ফ্রাঙ্কল্যান্ড ব্রিজের ওপর লিমনের ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। ময়নাতদন্তের রিপোর্টে লিমনের শরীরে একাধিক ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। এর মধ্যে তার পিঠের নিচের দিকে একটি গভীর ক্ষত পাওয়া গেছে যা তার লিভার ভেদ করে গিয়েছিল।
প্রসিকিউটররা আদালতকে জানিয়েছেন, লিমনের বন্ধু নাহিদা বৃষ্টির পরিণতিও একই রকম হয়েছে এবং তাকেও একইভাবে ব্রিজের আশপাশে কোথাও ফেলে দেওয়া হয়েছে বলে তাদের ধারণা।
নাহিদা বৃষ্টির পরিবারকে ইতিমধ্যে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, বৃষ্টির বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ক্ষীণ। এর পেছনে বড় কারণ হিসেবে তারা লিমন ও হিশামের শেয়ার করা অ্যাপার্টমেন্টে ‘বিপুল পরিমাণ রক্ত’ দেখেছেন। বৃষ্টির ভাই সিএনএন-এর সহযোগী সংবাদমাধ্যম ডব্লিউটিএসপি-কে জানিয়েছেন, অ্যাপার্টমেন্টে পাওয়া রক্তের পরিমাণ দেখে গোয়েন্দারা নিশ্চিত যে সেখানে বড় ধরনের কোনো সহিংসতা ঘটেছে।
উল্লেখ্য, রোববার রাতে হাওয়ার্ড ফ্রাঙ্কল্যান্ড ব্রিজের দক্ষিণ দিকের জলাশয় থেকে কিছু মানুষের দেহাংশ উদ্ধার করা হয়েছে, তবে ডিএনএ পরীক্ষার আগে তা বৃষ্টির কি না তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
তদন্তের শুরুতে হিশাম আবুঘারবিয়া গোয়েন্দাদের জানিয়েছিলেন, তিনি ওইদিন লিমন বা বৃষ্টি কাউকে দেখেননি। এমনকি তিনি দাবি করেছিলেন, তার গাড়িতে তারা কখনোই ওঠেননি এবং তিনি ক্লিয়ারওয়াটার বিচ এলাকাতেও যাননি।
লিমন ও বৃষ্টি সর্বশেষ ১৬ এপ্রিলের দিকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এলাকায় দেখা গিয়েছিল এবং পরদিন তাদের নিখোঁজ ঘোষণা করা হয়।
তবে প্রসিকিউটররা আদালতে হিশামের মিথ্যা জবানবন্দি খণ্ডন করতে নিচের প্রমাণগুলো উপস্থাপন করেন:
১. মোবাইল ও গাড়ির লোকেশন: লিমনের ফোনের শেষ লোকেশন এবং হিশামের গাড়ির লোকেশন একই সময়ে ক্লিয়ারওয়াটার বিচে পাওয়া গেছে। যখন তাকে এই প্রমাণের মুখোমুখি করা হয়, তখন হিশাম তার বয়ান বদলে বলেন যে, তিনি লিমন ও তার বান্ধবীকে সেখানে নামিয়ে দিতে গিয়েছিলেন।
২. আঙুলে ব্যান্ডেজ ও অদ্ভুত অজুহাত: জেরা করার সময় গোয়েন্দারা হিশামের বাম হাতের কনিষ্ঠ আঙুলে ব্যান্ডেজ দেখতে পান। হিশাম দাবি করেন পেঁয়াজ কাটতে গিয়ে তিনি ব্যথা পেয়েছেন। তবে প্রসিকিউটরদের ধারণা, ধস্তাধস্তির সময় এই চোট লেগে থাকতে পারে।
৩. আলামত মোছার সরঞ্জাম: লিমন ও হিশামের অ্যাপার্টমেন্ট থেকে একটি সিভিএস ফার্মেসির রসিদ পাওয়া গেছে। ১৬ এপ্রিলের সেই রসিদে দেখা যায়, হিশাম প্রচুর পরিমাণে ট্র্যাশ ব্যাগ, লাইসল ওয়াইপস এবং ফেব্রেজ কিনেছিলেন-যা মূলত খুনের আলামত ও রক্তের গন্ধ মোছার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
হিশাম আবুঘারবিয়ার বিরুদ্ধে বর্তমানে জোড়া খুনের (পরিকল্পিত হত্যা) পাশাপাশি মৃতদেহ লুকিয়ে ফেলা, আলামত নষ্ট করা, ভুয়া বন্দিত্ব এবং শারীরিক আঘাতের একাধিক অভিযোগ আনা হয়েছে। গত শুক্রবার একটি সাধারণ ঘরোয়া বিবাদের সূত্র ধরে পুলিশ তার বাড়িতে গেলে এই ভয়াবহ সত্য প্রকাশ্যে আসে।
আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে
আগামীকাল মঙ্গলবার হিশামের প্রি-ট্রায়াল ডিটেনশন (বিচার শুরুর আগে আটকাদেশ) শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে প্রসিকিউটররা তাকে বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিনা জামিনে কারাগারে রাখার পক্ষে যুক্তি দেবেন।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


