সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে লাল আভা। দূর থেকে দেখলে মনে হবে, সবে জেগেছে সূর্য! কাছে গেলেই দৃষ্টিভ্রম ভাঙে। এটি সেই দামি আম মিয়াজাকি। সূর্যের অবয়ব থাকায় জাপানিরা বলে ‘তাইয়ো নো তামাগো’; বাংলায় ‘সূর্যডিম’! সাড়া জাগানো এই আম এখন বাংলাদেশের বাগানে।

জাপানের মিয়াজাকি আমের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগসূত্র ঘটান কৃষিবিদ মীর শাহীনুর রহমান। যিনি বিদেশে থিতু হওয়ার সুযোগ ছেড়ে বেছে নিয়েছিলেন দেশের কৃষিকে। নাটোর সদর উপজেলায় কৃষিবিদ নার্সারিতে বিস্তৃত একটি ফলবাগান। সেখানেই মিয়াজাকি আমের বাণিজ্যিক বিস্তার।
রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করে ১৯৯৫ সালে তিনি বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটে চাকরি নেন। একই বছরের সেপ্টেম্বরে জাপানে উচ্চশিক্ষার জন্য একটি স্কলারশিপ পান। শুরু হয় তাঁর দীর্ঘ বিদেশযাত্রা। জাপানে পড়াশোনা ও গবেষণার পর ২০০১ সালে দেশে ফেরেন। ফেরার পর সামনে খুলে যায় আরেক সম্ভাবনার দরজা। যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার সুযোগ ছিল; স্ত্রীরও ছিল ভিসা। চাইলে সপরিবারে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী হতে পারতেন। সে পথে হাঁটেননি শাহীনুর। বিদেশের আয়েশি জীবন ছেড়ে ফেরেন নিভৃত গ্রামের মাটিতে। দেশে ফিরে নাটোরে পৈতৃক সূত্রে পাওয়া জমিতে প্রতিষ্ঠা করেন ‘কৃষিবিদ নার্সারি ও ফলবাগান’। শুরুর পথটা ছিল কাঁটায় ভরা। রাজশাহী থেকে কিছু আমের কলম এনে বাগান করেন। তবে অধিকাংশ ফলই টক হয়ে যায়; আবার মারাও যায় কিছু গাছ। অনেকেই তখন তাঁর উদ্যোগ ‘ব্যর্থ’– এমন আওয়াজ তুলছিলেন।
দমে যাননি শাহীনুর। সমকালকে বললেন, শুরুতে ধাক্কা খেয়েছি। তবে বিশ্বাস করতাম, গবেষণাভিত্তিক কৃষি করলে একদিন সফলতা আসবেই।
২০১৪ সালে কৃষিবিদ ড. আমজাদের সহায়তায় জাপান থেকে মিয়াজাকি আমের পাঁচটি সায়ান বা কলমের অংশ দেশে আনেন শাহীনুর। তখন খুব কম মানুষই এই আমের নাম শুনেছেন। বাজারে এর কোনো পরিচিতি ছিল না। সেই পাঁচটি সায়ান থেকেই শুরু হয় বাংলাদেশের মিয়াজাকি অধ্যায়।
শাহীনুর রহমান বলেন, প্রথম দিকে কেউ চারা নিতে চাইত না। সবাই ভাবত, বিদেশি আম, আমাদের দেশে হবে না। আম্রপালির ক্ষেত্রেও একসময় এমন ধারণা ছিল। এখন তো আম্রপালি দেশে রাজত্ব করছে। ধীরে ধীরে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। সামাজিক মাধ্যমে লাল রঙের এই আমের ছবি ছড়িয়ে পড়ে। আগ্রহ বাড়ে কৃষকের। এক সময় মিয়াজাকির চারা সংগ্রহে তাঁর নার্সারিতে ভিড় শুরু হয়। এখন পর্যন্ত তিনি সারাদেশে ৫০ হাজারের বেশি মিয়াজাকির চারা বিক্রি করেছেন। নিজেও গড়ে তুলেছেন বড় আকারের বাণিজ্যিক বাগান।
বিশ্বের দামি আম
মিয়াজাকি শুধু একটি আমের নাম নয়; এটি একটি ব্র্যান্ড। জাপানের কিউশু দ্বীপের মিয়াজাকি অঞ্চলে উৎপাদিত এই আমকে বিশ্বের সবচেয়ে দামি ফল হিসেবে গণ্য করা হয়। জাপানি ভাষায় ‘মিয়াজাকি’ শব্দের সঙ্গে ‘তাইয়ো নো তামাগো’ বা ‘এগ অব দ্য সান’ নামটিও সমান জনপ্রিয়। গাঢ় লাল রং, ডিমের মতো আকৃতি, অসাধারণ মিষ্টতা, সুগন্ধ ও মাখনের মতো নরম শাঁস– এসব বৈশিষ্ট্যের জন্য এ আমের আলাদা খ্যাতি রয়েছে।
জাপানে ২০১৯ সালে এক জোড়া প্রিমিয়াম মিয়াজাকি আম প্রায় পাঁচ হাজার মার্কিন ডলারে বিক্রি হয়েছিল, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় চার লাখ টাকার বেশি। ভারতে গত বছর এক কেজি মিয়াজাকি আম আড়াই লাখ রুপিতে বিক্রির খবরও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
তবে বাংলাদেশের বাস্তবতা ভিন্ন। এখানে একই আমের কেজি বিক্রি হয় ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায়। দুই বছর আগে শাহীনুর রহমান প্রতি কেজি দুই হাজার টাকা পর্যন্ত পেয়েছিলেন। তবে উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দাম কমছে। শাহীনুর বলেন, বিশ্বের দামি আম বলে এর সুখ্যাতি আছে। তবে জাপান আর আমাদের উৎপাদন ব্যবস্থা এক নয়। তাই দামও এক হবে না।
মিয়াজাকির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ তার রঙিন উজ্জ্বলতা। তবে এই রং পাওয়া ততটা সহজ নয়। কৃষিবিদদের মতে, এ জাতের আম রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণের প্রতিও তুলনামূলক বেশি সংবেদনশীল।
‘বছরব্যাপী ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন’ প্রকল্পের সাবেক পরিচালক ড. মো. মেহেদী মাসুদ বলেন, দেশের অন্য আমের চেয়ে মিয়াজাকিতে মাছির আক্রমণ বেশি হয়। ফলে ব্যবস্থাপনায় বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। প্রতিটি ফলে পর্যাপ্ত সূর্যালোক পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হয়। সূর্যের আলো ঠিকমতো না পেলে মিয়াজাকির আসল রং আসে না।
পাহাড়ে-সমতলে বাড়ছে চাষ
এখন দেশের পার্বত্যাঞ্চল থেকে সমতল সবখানেই মিয়াজাকির চাষ ছড়িয়ে পড়ছে। খাগড়াছড়ির মহালছড়ির কৃষি উদ্যোক্তা হ্লাশিং মং চৌধুরী চার বছর ধরে মিয়াজাকি উৎপাদন করছেন। এ বছর তাঁর বাগানে প্রায় এক হাজার ২০০ কেজি আম উৎপাদিত হয়েছে। তিনি বলেন, প্রতিবছর উৎপাদন বাড়ছে। বাজারেও চাহিদা তৈরি হয়েছে। এ বছর প্রতি কেজি ৬০০ টাকা দরে মিয়াজাকি বিক্রি করছি।
খাগড়াছড়ির কৃষি উদ্যোক্তা রিপল চাকমার বাগানেও রয়েছে প্রায় ৫০টি মিয়াজাকি গাছ। তিনি মনে করেন, এ আমের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রয়োজন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মিয়াজাকি আমের উৎপাদন ধারাবাহিকভবে বাড়ছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছিল প্রায় পাঁচ টন। পরের বছর তা বেড়ে ১০ টনে পৌঁছায়। ২০২১-২২ অর্থবছরে উৎপাদন হয় ২০ টন। ধারাবাহিকভাবে বাড়তে বাড়তে চলতি অর্থবছরে ৩০ টন উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
২০১৭ সাল থেকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ‘বছরব্যাপী ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন’ প্রকল্পের আওতায় মিয়াজাকিকে বাণিজ্যিক চাষে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের আবহাওয়া ও মাটি মিয়াজাকি চাষের জন্য মোটামুটি উপযোগী। তবে আন্তর্জাতিক মানের ফল উৎপাদন করতে হলে উন্নত ব্যবস্থাপনা, মান নিয়ন্ত্রণ এবং বাজারজাত ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রয়োজন। বিশ্বের সবচেয়ে দামি আম হয়েও বাংলাদেশে মিয়াজাকির দাম তুলনামূলক কম।
আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে
এর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ফল বিশেষজ্ঞরা বলেন, জাপানে মিয়াজাকি অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে উৎপাদিত হয়। গ্রিনহাউস, নির্দিষ্ট তাপমাত্রা, আলোর প্রতিফলন, হাতে বাছাই এবং কঠোর মান নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে প্রতিটি ফল বাজারে আসে। ‘তাইয়ো নো তামাগো’ গ্রেড পাওয়ার জন্য প্রতিটি আমের ওজন, রং, আকৃতি ও মিষ্টতার মাত্রাও পরীক্ষা করা হয়। এ ছাড়া জাপানে দামি ফল উপহার দেওয়ার একটি দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রয়েছে। করপোরেট উপহার, সামাজিক মর্যাদা ও বিলাসবহুল পণ্যের বাজারও এ ফলের মূল্য বাড়িয়ে দেয়। বাংলাদেশে এখনও তেমন প্রিমিয়াম ফলের বাজার তৈরি হয়নি। এখানে মিয়াজাকি মূলত আগ্রহ, কৌতূহল ও সীমিত বাণিজ্যিক চাহিদার একটি পণ্য।
সূত্র ও ছবি : সমকাল
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।



