বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ‘বহু বছর হয়ে গেছে আমরা ভোট দেওয়ার সুযোগ পাইনি। এর আগে আমাদের ভোট বিভিন্নজন বিভিন্নভাবে লুট করে নিয়ে গেছে। সেজন্যই এবার আমাদের সজাগ থাকতে হবে, কেউ যেন আমাদের ভোট লুট বা ভোটের ফলাফল ছিনতাই করে নিয়ে যেতে না পারে। তাই ভোটের দিন কেন্দ্র ও ভোট পাহারা দিতে হবে। নিজেদের ভোটের হিসাব নিজেদেরই কড়ায়গন্ডায় বুঝে নিতে হবে। এই দেশের মালিক যে জনগণ-সেই জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন বা বাস্তবায়ন যাতে হতে পারে সেজন্যই দরকার ভোটের অধিকার।’ তিনি বলেন, অথচ তথাকথিত নির্বাচনের মাধ্যমে এতদিন দেশে নিশিরাতের ভোট হয়েছে। আমি-ডামির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
গতকাল বিকালে ময়মনসিংহের ঐতিহাসিক সার্কিট হাউজ প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বেলা ৩টা ৫৫ মিনিটে সার্কিট হাউজ ময়দানের বিশাল মঞ্চে যখন তারেক রহমান ওঠেন তখন স্লোগানে স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে গোটা সমাবেশস্থল। ২৬ মিনিট বক্তব্য দেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমান। এ সময় তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন। দীর্ঘ ২৩ বছর পর তারেক রহমান ময়মনসিংহের কোনো জনসভায় অংশ নিলেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘ফ্যাসিস্টদের শাসনামলে ভোটের যে অধিকার ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল সেই অধিকারের জন্য মানুষ গত ১৬ বছর গুম-খুন অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার হয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে হাজারো মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। আহত করা হয়েছে অগণিত মানুষকে। সেই ভোটের অধিকার আপনারা প্রয়োগ করতে যাচ্ছেন আগামী ১২ তারিখে।’ ধানের শীষে ভোট দিয়ে বিএনপি প্রার্থীদের জয়যুক্ত করার জন্য দলমতনির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে সবাইকে ‘একাত্তরের মতো ঐক্যবদ্ধ’ থেকে কাজ করতে হবে। বিএনপি অতীতের মতো দেশ ও মানুষের জন্য কাজ করতে চায়। বেকারদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাসহ দুর্নীতি ও মাদকমুক্ত দেশ গড়তে চায়। দেশের মানুষের নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখার অভিজ্ঞতা আছে বিএনপির। সবাই ঐক্যবদ্ধ থাকলে দেশ এগিয়ে যাবে, সুশাসন কায়েম হবে।
ময়মনসিংহ দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও ময়মনসিংহ-৫ (মুক্তাগাছা) আসনের প্রার্থী জাকির হোসেন বাবলুর সভাপতিত্বে ও ময়মনসিংহ-৪ (সদর) আসনের প্রার্থী আবু ওয়াহাব আকন্দ ওয়াহিদ, ময়মনসিংহ-২ (ফুলপুর-তারাকান্দা) আসনের প্রার্থী মোতাহার হোসেন তালুকদার এবং ময়মনসিংহ দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্যসচিব রোকনুজ্জামান সরকার রোকনের পরিচালনায় জনসভা মঞ্চে নিরাপত্তা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার (অব.) শামস, বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক (ময়মনসিংহ বিভাগ) শরীফুল আলম, কোষাধ্যক্ষ রশিদুজ্জামান মিল্লাত, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ছাড়াও জনসভায় ময়মনসিংহ বিভাগের ২৪টি আসনের ধানের শীষের প্রার্থীরা উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা হলেন ময়মনসিংহ-১ আসনের সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, ময়মনসিংহ-২ আসনের মোতাহার হোসেন তালুকদার, ময়মনসিংহ-৩ আসনের এম ইকবাল হোসেইন, ময়মনসিংহ-৪ আসনের আবু ওয়াহাব আকন্দ ওয়াহিদ, ময়মনসিংহ-৫ আসনের মোহাম্মদ জাকির হোসেন, ময়মনসিংহ-৬ আসনের আখতারুল আলম, ময়মনসিংহ-৭ আসনের মাহাবুবুর রহমান, ময়মনসিংহ-৮ আসনের লুৎফুল্লাহেল মাজেদ, ময়মনসিংহ-৯ আসনের ইয়াসের খান চৌধুরী, ময়মনসিংহ-১০ (গফরগাঁও) আসনের মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামান বাচ্চু ও ময়মনসিংহ-১১ আসনের ফখর উদ্দিন আহমেদ।
জামালপুরের প্রার্থীরা হলেন জামালপুর-১ আসনের এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, জামালপুর-২ আসনের এ ই সুলতান মাহমুদ বাবু, জামালপুর-৩ আসনের মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল, জামালপুর-৪ আসনের ফরিদুল কবীর তালুকদার এবং জামালপুর-৫ আসনের শাহ মো. ওয়ারেছ আলী মামুন।
নেত্রকোনার প্রার্থীরা হলেন নেত্রকোনা-১ আসনের কায়সার কামাল, নেত্রকোনা-২ আসনের আনোয়ারুল হক, নেত্রকোনা-৩ আসনের রফিকুল ইসলাম হিলালী, নেত্রকোনা-৪ আসনের লুৎফুজ্জামান বাবর এবং নেত্রকোনা-৫ আসনের আবু তাহের তালুকদার। শেরপুরের প্রার্থীরা হলেন শেরপুর-১ আসনের সানসিলা জেবরিন প্রিয়াঙ্কা, শেরপুর-২ আসনের মোহাম্মদ ফাহিম চৌধুরী, শেরপুর-৩ আসনের মাহমুদুল হক রুবেল প্রমুখ।
তারেক রহমান বলেন, ‘যে স্বৈরাচার পালিয়ে গিয়েছে সেই স্বৈরাচারের মুখের ভাষা বিএনপির বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে একটি রাজনৈতিক দল। দলটি বলছে বিএনপি নাকি দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন ছিল। আমার প্রশ্ন ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তাদেরও তো দুজন সদস্য বিএনপি সরকারে ছিল। তাহলে ওই দুই ব্যক্তি কেন পদত্যাগ করে চলে আসেনি? শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তারা বিএনপির সাথেই ছিল। তা ছাড়া টিআইবির রিপোর্টে বাংলাদেশ সর্বপ্রথম দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ২০০১ সালের ২৮ জুন। তখন বাংলদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় কারা ছিল? এতেই প্রমাণিত হয় কত বড় মিথ্যা কথা তারা বলছে।’
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমাদের রাজনীতি দেশের মানুষের জন্য। এই নির্বাচনি জনসভায় আমরা দেখি অনেক দল অন্য দল সম্পর্কে বিভিন্ন রকম নেতিবাচক কথা বলে, গিবত করে। এসব সমালোচনায় জনগণের কি লাভ? জনগণের জন্য যদি কাজ করতে হয় তাহলে অবশ্যই একটি রাজনৈতিক দলের পরিকল্পনা থাকতে হবে। দেশ পরিচালনার পরিকল্পনা ও অভিজ্ঞতা দুটোই থাকতে হবে।’
নারীদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বী হওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়ে বিএনপি চেয়ারম্যান আরও বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে নারীদের জন্য ফ্যামিলি কার্ড চালু করা হবে।
কৃষকদের জন্য বিশেষ পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে কৃষকদের তালিকা করে কৃষক কার্ড দেওয়া হবে। এই কার্ডের মাধ্যমে বছরে অন্তত একটি ফসলের জন্য প্রয়োজনীয় বীজ, সার ও কীটনাশক সরকারিভাবে সরবরাহ করা হবে। বেকার তরুণদের কর্মসংস্থানের বিষয়ে তারেক রহমান বলেন, জেলাভিত্তিক কারিগরি ও ভাষা শিক্ষা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দেশে ও বিদেশে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে। বেকার যুবকরা কর্মসংস্থান পেলে মাদকের ভয়াবহতাও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে। জলাবদ্ধতা নিরসন এবং কৃষিকাজের উন্নয়নে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের খাল কাটা কর্মসূচি আবার চালুর ঘোষণা দেন তারেক রহমান। তিনি জানান, নদীনালা ও খাল ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। বিএনপি সরকার গঠন করলে তিনি নিজে উপস্থিত থেকে এ কর্মসূচি শুরু করবেন। এ ছাড়াও মসজিদ-মাদ্রাসার খতিব, ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের জন্য সম্মানী ও বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার প্রতিশ্রুতি দেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, এতে ধর্মীয় নেতারা সম্মানজনক উপায়ে হালাল আয়ের সুযোগ পাবেন। উপস্থিত জনগণের উদ্দেশে বিএনপির শীর্ষনেতা বলেন, ‘সরকার গঠন করলে বিএনপি কী কী করবে সেটা সংক্ষিপ্তভাবে বলার চেষ্টা করেছি। আরও অনেক কাজ করব। তবে সেজন্য ১২ তারিখের নির্বাচনে ধানের শীষকে আপনাদেরকেই ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করতে হবে। নেত্রকোনা, শেরপুর ও জামালপুরের ২৪ জন ধানের শীষের প্রার্থী আছে। তাদের আমি দায়িত্ব দিয়েছি। যদি বিজয় আসে তাহলে আপনারা আপনাদের এলাকার উন্নয়ন বুঝে নেবেন তাদের কাছ থেকে।’
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল। তরুণ-যুবক যারা তারা আপনারা বইয়ের পাতায় পড়েছেন, মুরুব্বি যারা আছেন, আমাদের বয়সি যারা আছেন তারা দেখেছেন এবং জানেন সেই যুদ্ধে দেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিল। সেই যুদ্ধে বহু মানুষ শহীদ হয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে চব্বিশ সালের ৫ আগস্ট সেই স্বাধীনতাকে রক্ষা করেছেন এই দেশের ছাত্র-জনতাসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষ।’
সেই একাত্তর সালের যুদ্ধই হোক, চব্বিশের আন্দোলনই হোক; এতে কে পাহাড়ি মানুষ, কে সমতলের মানুষ, কে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর মানুষ এটি কিন্তু কেউ দেখেনি। রাজপথে সবাই পাশাপাশি আন্দোলন করেছে, একাত্তর সালে যুদ্ধে সবাই একসঙ্গে যুদ্ধ করেছে। কে মুসলাম, কে খ্রিস্টান, কে অন্য ধর্মের মানুষ কেউ দেখেনি। এবারও ১২ তারিখের নির্বাচনেও আমাদের সবাইকে ঠিক একইভাবে ধর্মবর্ণনির্বিশেষে একসঙ্গে থাকতে হবে। একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘আমরা যেভাবে স্বাধীনতা অর্জন করেছি, যেভাবে স্বৈরাচার বিদায় করেছি, আমরা যদি ইনশাল্লাহ সামনের দিনে একসঙ্গে থাকি তাহলে অবশ্যই এই বাংলাদেশকে ভবিষ্যতে আমাদের সেই প্রত্যাশিত বাংলাদেশের দিকে নিয়ে যেতে পারব।’
বিএনপি চেয়ারম্যান ময়মনসিংহ, জামালপুর, নেত্রকোনা ও শেরপুরের বিএনপিদলীয় ২৩ প্রার্থীকে ধানের শীষ হাতে দিয়ে উপস্থিত জনতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘তাদের বিজয়ী করে আপনাদের সেবা করার সুযোগ দেবেন।’
সারাদেশে নির্বাচনি প্রচারাভিযানের অংশ হিসেবে তারেক রহমান দুপুরে সড়কপথে ময়মনসিংহ আসেন। সার্কিট হাউজের বিশাল মাঠে ময়মনসিংহ, জামালপুর, নেত্রকোনা, শেরপুর-এই চার জেলা থেকে নেতা-কর্মীরা অংশ নেন। ঢাকা থেকে সড়কপথে তারেক রহমান ময়মনসিংহ শহরে পৌঁছান বেলা সাড়ে তিনটায়। ভিড় ডিঙিয়ে তাঁর গাড়িবহর সার্কিট হাউজ মাঠে পৌঁছাতে নিরাপত্তাকর্মীদের বেগ পেতে হয়। বিএনপির এই নির্বাচনি জনসভায় মানুষের ঢল নামে। দুপুরের আগেই কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায় সমাবেশস্থল। দলীয় নেতা-কর্মী ও সম্মিলিত মুহুর্মুহু স্লোগানে মুখরত হয়ে ওঠে ময়মনসিংহ শহর।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


