ইউক্রেনের ধারাবাহিক হামলার মুখে রাশিয়া-নিয়ন্ত্রিত ক্রিমিয়ায় সাধারণ মানুষের জন্য জ্বালানি বিক্রি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। ইউক্রেনের সাম্প্রতিক হামলায় রাশিয়ার দখলকৃত অঞ্চলগুলোর সরবরাহপথ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আগে থেকেই সেখানে জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছিল এবং রেশনিং ব্যবস্থা চালু ছিল। বিবিসির প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

ক্রিমিয়ার গভর্নর সের্গেই আকসিওনভ জানিয়েছেন, ব্যক্তি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে এখন আর পেট্রোল স্টেশন থেকে জ্বালানি দেওয়া হবে না। শুধুমাত্র সরকারি সংস্থাগুলোর কাছে জ্বালানি সরবরাহ করা হবে, যারা ক্রিমিয়ার “কার্যক্রম ও নিরাপত্তা” নিশ্চিত করার দায়িত্বে রয়েছে।
এর আগে তিনি দাবি করেন, রাতভর ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় কের্চ শহরের একটি তেল সংরক্ষণাগারে চারজন নিহত এবং ২৮ জন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এই হামলাকে “রাশিয়ার বর্বর আক্রমণের ন্যায্য জবাব” বলে অভিহিত করেছেন।
২০১৪ সালে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে রাশিয়া ক্রিমিয়া দখল করে নেয়। এরপর থেকে অঞ্চলটি নানা ধরনের সরবরাহ সংকট ও লজিস্টিক সমস্যার মুখোমুখি হলেও এবারই সবচেয়ে কঠোর জ্বালানি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে আকসিওনভ বলেন, “ক্রিমিয়ার জ্বালানি বাজার নিয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত পরে জানানো হবে।”
জেলেনস্কি জানিয়েছেন, ইউক্রেন ক্রিমিয়ার পাশের কের্চ প্রণালীর ওপারে অবস্থিত রাশিয়ার ক্রাসনোদার অঞ্চলে তেল পরিবহনের একটি গুরুত্বপূর্ণ লজিস্টিক স্থাপনাতেও হামলা চালিয়েছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ওই হামলায় একটি যাত্রীবাহী ফেরিতে থাকা একজন নিহত হয়েছেন।
এ ছাড়া সামরিক লজিস্টিক স্থাপনা ও রাডার ব্যবস্থাও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলে জানান জেলেনস্কি, যদিও তিনি সুনির্দিষ্ট অবস্থান উল্লেখ করেননি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, “রাশিয়া শুধু শক্তির ভাষাই বোঝে, আর আমাদের দীর্ঘপাল্লার সক্ষমতা অবশ্যই শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করছে।”
জেলেনস্কি আরও জানান, সপ্তাহান্তে রাশিয়ার হামলায় অন্তত সাতজন নিহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে শিশুদেরও রয়েছে এবং আহতের সংখ্যা ৩০ জনের বেশি।
অন্যদিকে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, রাতভর ইউক্রেনের ২৩৯টি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে।
ক্রিমিয়া রাশিয়ার জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখান থেকে মস্কোর বাহিনী ইউক্রেনের বিভিন্ন অঞ্চলে হামলা পরিচালনা করে থাকে।
এটি রাশিয়ানদের জনপ্রিয় গ্রীষ্মকালীন অবকাশযাপন কেন্দ্রও। তবে সাম্প্রতিক জ্বালানি সংকটের কারণে অনেক পর্যটক বাড়ি ফেরার জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি সংগ্রহে সমস্যার কথা জানিয়েছেন।
চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধে যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা স্থবির হয়ে পড়ায় উভয় পক্ষই সাম্প্রতিক মাসগুলোতে হামলার মাত্রা বাড়িয়েছে।
মস্কোর যুদ্ধ তহবিলের অন্যতম প্রধান উৎস জ্বালানি রপ্তানি। তাই ইউক্রেনের কৌশল হলো রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোতে আঘাত হেনে সেই অর্থের প্রবাহ ব্যাহত করা।
একই সঙ্গে ইউক্রেন রাশিয়ার যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতা দুর্বল করা এবং সাধারণ মানুষের জীবনে অস্থিরতা তৈরি করে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ওপর চাপ বাড়াতে চায়, যাতে তিনি আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য হন।
তবে এখন পর্যন্ত পুতিন আলোচনায় আগ্রহী—এমন কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। জুনের শুরুতে জেলেনস্কির সরাসরি বৈঠকের প্রস্তাবও তিনি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
যুদ্ধের চার বছরে ইউক্রেন নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্পে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। বিশেষ করে মাঝারি ও দীর্ঘপাল্লার ড্রোন প্রযুক্তিতে দেশটি দ্রুত সক্ষমতা বৃদ্ধি করেছে এবং বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন মিত্র দেশকে এ বিষয়ে পরামর্শ ও প্রযুক্তিগত সহায়তাও দিচ্ছে।
তবে এই সাফল্যের একটি বিপরীত দিকও রয়েছে। ইউক্রেনের প্রতিটি সফল হামলা, যা পুতিনকে বিব্রত করে, তার পাল্টা জবাবও প্রায় অনিবার্য হয়ে ওঠে।
গত বৃহস্পতিবার ইউক্রেনের বৃহত্তম হামলাগুলোর একটিতে মস্কোর একটি তেল শোধনাগারে আঘাত হানার পর আকাশ থেকে কালো তেলের কণা ঝরে পড়তে দেখা যায়।
আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে
এ অবস্থায় কিয়েভসহ ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরের মানুষ এখন রাশিয়ার সম্ভাব্য পাল্টা হামলার আশঙ্কায় অপেক্ষা করছে।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।



