images (4)

Advertisement

জুমবাংলা ডেস্ক: হাজারা জনগোষ্ঠী ১৯ শতকের শেষের দিক থেকেই ধর্মীয় এবং জাতিগতভাবে নির্মূলকরণের শিকার। কিছু কিছু ইতিহাসবিদ মনে করেন আফগান শাসক আবদুর রেহমান তার (১৮৮০-১৯০১) শাসনামলে অর্ধেক হাজারা জনগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে এবং তারা বাধ্য হয়েছে মাতৃভূমি আফগানিস্তান ছাড়তে। তারপর ১৯৯০ সালের মাঝামাঝি এসে হাজারা জনগোষ্ঠী আফগানিস্তানের তালেবান এবং আল-কায়েদার হাতে নির্মম নিপীড়ন এবং গণহত্যার শিকার হয়।

২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্র তালেবান সরকারকে উৎখাত করলে সাময়িকভাবে হাজারাদের নিরাপত্তা কিছুটা বাড়ে। কিন্তু সেটা তো বালির বাঁধ, কিছুদিনের মধ্যেই তালিবান আবার শক্তিশালী হয়ে ওঠে, আফগানিস্তানে দায়েশের (আইসিস) মত নতুন জঙ্গি দলের আগমন ঘটে ফলে হাজারাদের উপর নেমে নিত্য নতুন আক্রমণ। সবজঙ্গি মিলেমিশে হাজারা পথচারীদেরকে তাদের যাত্রাপথে গাড়ি থেকে নামিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা করতে শুরু করে।

১৮৯০ সালের শুরুতে হাজারা জনগোষ্ঠীর উপর নিয়মিত হত্যাকাণ্ড চলতে থাকায় তারা ভয়ে দলে দলে পালিয়ে যেতে থাকে প্রতিবেশী ইরান এবং তৎকালীন ব্রিটিশ ইন্ডিয়াতে। প্রাণের দায়ে পালিয়ে আসা বেশীরভাগ হাজারাদের আশ্রয় হয় ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার কোয়েটায় (বর্তমানে পাকিস্তানে) এবং কোয়েটাতে তারা বেশ সুখে শান্তিতেই ছিল।

এমনকি ১৯০৪ সালে ইন্ডিয়াতে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর কমান্ডার ইন চিফ লর্ড কিচনার, মেজর ক্লদ জ্যাকবকে কোয়েটার হাজারা যুবকদের নিয়ে আলাদা রেজিমেন্ট গঠন করতে নির্দেশ দেন। নতুন সেনাদলের নাম দেয়া হয় ‘১০৬তম হাজারা পায়োনিয়ার’ যদিও ১৯৩৩ সালের মধ্যেই নবগঠিত সেনাদলকে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়।

বেলুচিস্তানে তারা শতাধিক বছর ধরে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করে আসছিল। কিন্তু হাজারাদের শান্তি বুঝি বেশিদিন সয় না, বেলুচিস্তানেও তাদের উপর শুরু হয়ে গেল হত্যা, নিপীড়ন, গুম, সন্ত্রাসী আক্রমণ। তাদের মুখের আদল সেন্ট্রাল এশিয়ান হওয়ার কারণে বেলুচিস্তানের অন্যান্য জনগোষ্ঠীদের থেকে হাজারাদের সহজেই আলাদা করা যায়। ফলে হাজারা সম্প্রদায়ের লোকজন হত্যা খুনের সহজ নিশানায় পরিণত হয়।

কোথা থেকে এসেছে এই হাজারা জনগোষ্ঠী?

হাজারা জনগোষ্ঠী বেলুচিস্তানে শতাধিক বছর ধরে শান্তিতে বসবাস করলেও এই শতকের মাঝেই তাদের জনসংখ্যার বিরাট একটা অংশ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। ২০০৬ সাল থেকে বিভিন্ন জঙ্গি-দল, জঙ্গি-দলের স্থানীয় সাগরেদ নিয়মিত বিরতিতে হাজারাদেরকে নিপীড়ন এবং হত্যা চালিয়ে যেতে থাকে।

স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলো দেশে বিদেশে এই জনগোষ্ঠীর পরিচিতি তুলে ধরেছে তবুও এখনো পাকিস্তানী জনগণের মনে ‘চায়নিজ চেহারার’ পাকিস্তানি হাজারাদের ইতিহাস এবং কোথা থেকে এসেছে জেনে বিস্ময় জাগে। হাজারাদের ভৌগলিক ইতিহাসের উৎস-ভূমি বর্তমানের আফগানিস্তান। বহুকাল ধরে তারা মধ্য আফগানিস্তানের ‘হাজারাত’ নামক স্থানের শুকনো পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাস করে আসছিল এবং তারা প্রায় সবাই ধর্মে শিয়া মতাবলম্বী মুসলিম।

ভারতে মোঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা জহিরউদ্দিন মুহম্মদ বাবর (১৪৮৩-১৫৩০) তার আত্মজীবনী ‘বাবুরনামা’ গ্রন্থে আফগানিস্তানের হাজারিস্তান এবং ১৫০৫ সালে পাঞ্জশির উপত্যকায় হাজারার তুর্কি আদিবাসীদের সাথে যুদ্ধের কথা আলোচনা করেছেন। হাজারা জনগোষ্ঠীর নৃতাত্ত্বিক উৎস সম্পর্কে নানান মতবাদ প্রচলিত আছে।

যুক্তরাষ্ট্রের পোর্টল্যান্ড ইউনিভার্সিটির ‘দক্ষিণ এশিয়া এবং আফগানিস্তান’ গবেষক প্রফেসর গ্রান্ট ফার বলেন, হাজারা জনগোষ্ঠী হলো ১৩শতকের বর্তমানের আফগানিস্তানের মঙ্গল বংশের অবশিষ্ট জনসংখ্যা। প্রফেসর ফার মনে করেন হাজারাদের পূর্বপুরুষেরা চেঙ্গিস খানের ছেলে চাগাতাই’র সৈনিক ছিল। চাগাতাই ১৩ শতকে চেঙ্গিস খানের কাছ থেকে এই অঞ্চল শাসনের দায়িত্ব পায়। হাজারাদের মুখের আদলেও মধ্য এশিয়ার মঙ্গলয়েড প্রভাব প্রকটভাবে লক্ষ করা যায়। চোখের নিচের হাড় উঁচু, মুখে অল্প দাড়ি, ছোট চোখের কারণে তাদেরকে অন্যান্য নৃগোষ্ঠী থেকে আলাদাভাবে চেনা যায়।

হাজারাদের ‘হাজারাগি’ ভাষাতেও তাদের মঙ্গল পূর্বপুরুষের প্রভাবের প্রমাণ পাওয়া যায়। হাজারাগি হলো পার্সি ভাষার আঞ্চলিক অপভ্রংশ। হাজারাগি ভাষায় বিপুল পরিমাণ পার্সি শব্দ আছে আর বাক্যের গঠন পার্সি, তুর্কি আর মঙ্গলের সংমিশ্রণ। অন্য একজন গবেষক জেমস মিনাহ্যান লিখেছেন হাজারা জনগোষ্ঠী তুর্কি আর মঙ্গলদের মিশেলে সৃষ্টি কিন্তু তাদের শারীরিক অবয়বে মঙ্গল প্রভাবের আধিক্য রয়ে গেছে।

হাজারা নামটা এসেছে মঙ্গলদের একটা যোদ্ধা দলের এক হাজার সেনা নিয়ে গঠিত বাহিনী এবং এসম্পর্কিত মিথ থেকে কিন্তু এখন হাজারা বলতে পাহাড়ি আদিবাসীকে বোঝায়। ২০১৭ সালে কোয়েটার ১৫৩ হাজারা পুরুষদের জেনেটিক স্টাডি করে জানা যায় জিনগত-ভাবে এই জনগোষ্ঠী মঙ্গল এবং কাজাখদের সাথে ঘনিষ্ঠ। ইতিপূর্বে পরিচালিত অন্য আর একটি গবেষণা থেকে জানা যায় দুই তৃতীয়াংশ হাজারা পুরুষ চেঙ্গিস খানের ওয়াই ক্রমোজোম বহন করে।

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Dedicated desk news writer with a sharp eye for breaking stories and a passion for delivering accurate, timely, and engaging content. Skilled in news research, fact-checking, and writing under tight deadlines, with a strong commitment to journalistic integrity and clarity.