শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক : ‘সাধুর নগরে বেশ্যা মরেছে’ নামের এক কবিতার একটি লাইন এমন, ‘গরিবের বৌ সস্তা জিনিস সবাই ডাকো ভাবি।’ কবিতাটি কার লেখা তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। অনেকে বলেন, এটা কাজী নজরুলের কবিতা, প্রকৃতপক্ষে এটি নজরুলের লেখা নয় বলেই ধারণা করা যায়। কেউ আবার বলেন কবিতাটির লেখক শেখ সাজ্জাদুল ইসলাম। কবিতাটি কার সেই বিতর্ক নিয়ে আজকের লেখা নয়। লেখার উদ্দেশ্য এটি জানান দেওয়া যে, বর্তমানের বাংলাদেশ হেনরি কিসিঞ্জারের তলাবিহীন ঝুড়ি নয়, বিধায় সে কোনো গরিবের বৌ নয় যে অন্যান্য দেশ তাকে ভাবি হিসেবে বেছে নেবে। কিন্তু পৃথিবীর পশ্চিমাঞ্চলের কয়েকটি দেশ ঠিক সেই কাজটিই করার চেষ্টা করছে।

Advertisement

আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষায় এরা নিজেদেরকে বাংলাদেশের সম্রাট ভাবার চেষ্টা করছে। বাংলাদেশকে নির্দেশনা দিচ্ছে কীভাবে নির্বাচন পরিচালিত হবে, কীভাবে মানবাধিকার রক্ষা করতে হবে ইত্যাদি। এসব দেশের ঢাকাস্থ দূতাবাসসমূহ যা করছে তা নিশ্চিতভাবে আন্তর্জাতিক আইন, জাতিসংঘ সনদ এবং কূটনীতি সম্পর্কীয় ১৯৬৪ সালের ভিয়েনা কনভেনশনের পরিপন্থী। দুঃখজনক হলো এই কাফেলায় শরিক হয়েছেন বাংলাদেশে জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারীও।

সম্প্রতি ঢাকা-১৭ আসনের উপনির্বাচনে আশরাফুল আলম ওরফে হিরো আলম নামক এক প্রার্থী প্রহৃত হওয়ার পর ঢাকায় কর্মরত কয়েকজন পশ্চিমা রাষ্ট্রদূতের তৎপরতা আকাশচুম্বী হয়ে যায়। অথচ ওই রাষ্ট্রদূতদের দেশেগুলোতে প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে এমনটা, যা নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই তাদের। গত সপ্তাহে মার্কিন মুলুকে দুজন বাংলাদেশীকে হত্যা করা হয়েছে। এ ছাড়াও সেদেশে অহরহ চলে হত্যাকাণ্ড, যে কথা পৃথিবীর কারও অজানা নেই।

অনেক সময় ওই দেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাও বেআইনিভাবে হত্যাকাণ্ড চালায়। ইংল্যান্ডে বহু বাঙালিকে বহুবার প্রহার করা হয়েছে, যার মধ্যে এক সময়ের মন্ত্রী হাসানুল হক ইনু ছিলেন, ছিলাম আমিও। ওই সময়ে আমাদের দুজনেরই কূটনৈতিক পাসপোর্ট ছিল—হাসানুল হক ইনু তখন মন্ত্রী, আর আমি হাইকোর্টের বিচারপতি। দুটি ঘটনাই লন্ডন পুলিশকে জানানো হয়েছিল, কিন্তু সেগুলো নিয়ে কোনো রাষ্ট্রদূত মুখ খোলেননি। ওই ঘটনা নিয়ে কারও চিন্তার জগতে বিপ্লব ঘটেনি।

যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিনিয়ত পুলিশের হাতে কৃষাঙ্গরা খুন হচ্ছেন। সে বিষয়েও এসব রাষ্ট্রদূতগণ নিরব। ওই দেশে মার্টিন লুথার কিং, ম্যালকম এক্সের মতো বিখ্যাত মানবাধিকার নেতাদের হত্যা করার পরও কোনো রাষ্ট্রদূত কোনো বার্তা পাঠায়নি। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে এরা এখন বাংলাদেশকে ‘গরিবের বৌ’ মনে করছেন তারা। এ ধরনের ঘটনা ঘটলে তদন্ত করা এবং অপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়ায় নেয়ার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট দেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার। বাংলাদেশেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাংলাদেশের পুলিশ এবং র‌্যাব তদন্তে নেমে যায়, এমনকি নির্বাচন কমিশনও তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী বেশ কয়েকজন ব্যক্তিকে সিসি টিভির মাধ্যমে শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, কয়েকজনকে রিমান্ডেও নেয়া হয়েছে। অর্থাৎ আমাদের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছে।

খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ বছর আগে চাণক্য পণ্ডিত রাজার দূতদের ওপর যেসব বাধা-নিষেধের কথা বলেছিলেন, আজও তা প্রযোজ্য বলে মনে হয়। এ বিষয়ে বিশিষ্ট আন্তর্জাতিক আইন বিশারদ এল, ওপেনহাইম আন্তর্জাতিক আইনের ওপর তাঁর লেখা বইতে উল্লেখ করেছেন, (যে বইটি পরবর্তী সংস্করণ লিখেছেন আন্তর্জাতিক আদালতের সাবেক বিচারক এইচ লটারপ্যাক্ট)—“এটা সার্বজনীনভাবে স্বীকৃত যে কূটনীতিকগণ প্রেরিত দেশের রাজনীতিতে নাক গলাবেন না। তারা সে দেশের রাজনীতি পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। নিজ দেশে সে বিষয়ে তথ্য পাঠাতে পারেন। কিন্তু সে দেশের রাজনৈতিক বিতর্কে জড়িত হতে পারেন না, হলে সেটা হবে কূটনৈতিক মর্যাদার অপব্যবহার।” ওপেনহাইম ১৯৫৫ সালে বইটি লেখার সময় ১৯৬৪ সালের কূটনীতি সংক্রান্ত ভিয়েনা কনভেনশন ছিল না। তিনি লিখেছেন প্রচলিত আন্তর্জাতিক আইনের বিধান মতে। ভিয়েনা কনভেনশনের বিধিনিষেধে আরও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। এই কনভেনশনে অবাঞ্ছিত দূতদের অপসারণের কথা বলা হয়েছে।

স্বয়ং যুক্তরাষ্ট্রই তার দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশি কূটনীতিকদের নাক গলানো সহ্য করে না বলে সেই ১৮৮৮ সালে ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত লর্ড ম্যাকভিলকে বহিষ্কার করেছিল, কারণ তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে নাক গলিয়েছিলেন। এরপরেও যুক্তরাষ্ট্র অনেকবার অনেক বিদেশি কূটনীতিককে বহিষ্কার করেছে। ১৯২৭ সালে ফরাসি সরকার সে দেশে কর্মরত সোভিয়েত রাষ্ট্রদূত রাকভস্কিকে ফিরিয়ে নেয়ার জন্য সোভিয়েত সরকারকে বলেছিল এজন্য যে, সোভিয়েত রাষ্ট্রদূত একটি রাজনৈতিক ঘোষণাপত্রে দস্তখত করেছিলেন। ১৯৭৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র সে দেশ থেকে সকল ইরানি কূটনীতিককে বহিষ্কার করেছিল। ২০১১ সালে সকল ইরানি কূটনীতিককে বহিষ্কার করেছিল ব্রিটিশ সরকার। ১৯৮৪ সালে ব্রিটিশ সরকার ২ জন নাইজেরিয়ান কূটনীতিককে বহিষ্কার করেছিল এবং নাইজেরিয়ান রাষ্ট্রদূতকে বিলেতে ফিরে না আসতে বলেছিল। ওই বছর ইংল্যান্ডে রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়ে বসবাসরত নাইজেরিয়ান প্রাক্তন মন্ত্রী আলহাজ ওমারা ডিকুকে ইংল্যান্ড থেকে অপহরণ করে নাইরেজিয়ায় পাচার চেষ্টার অপরাধে ব্রিটিশ সরকার ওই ব্যবস্থা নিয়েছিল। ১৯৮৩ সালে নিকারাগুয়া তার দেশের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের অভিযোগে ৩ জন মার্কিন কূটনীতিককে বহিষ্কার করেছিল। ২০২২ সালে নিকারাগুয়া ঘোষণা করে যে, তার দেশে মার্কিন রাষ্ট্রদূত রডবিগুয়েজকে নিকারাগুয়ার আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের কারণে সে দেশে প্রবেশ করতে দেয়া হবে না। যুক্তরাষ্ট্র সরকার নিকারাগুয়ার কর্মকর্তাদের ওপর ভিসা নিয়ন্ত্রণ চালু করলে যুক্তরাষ্ট্র-নিকারাগুয়া সম্পর্ক তলানিতে যাওয়ার পর নিকারাগুয়া ওই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ১৯৮৬ সালে ইংল্যান্ডে রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী ইজরাইলি পরমাণু বিজ্ঞানী মরদেকাই ভানুনুকে এক মোসাদ নারী গোয়েন্দার সহায়তায় (প্রেমের অভিনয় করে) আন্তর্জাতিক জলসীমায় নিয়ে গিয়ে সেখানে অপেক্ষামাণ ইজরাইলি নৌবহরে তুলে দেয়ার পর ব্রিটিশ পার্লামেন্টে দাবি উঠেছিল ইজরাইলি রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কার করার। কিন্তু পররাষ্ট্রমন্ত্রী পার্লামেন্টকে বলেছিলেন যে, ইজরাইলি রাষ্ট্রদূত বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ছিলেন না বিধায় তাকে বহিষ্কার করা যুক্তিসঙ্গত হবে না।

স্বাগতিক দেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের অভিযোগে কূটনীতিকদের বহিষ্কারের আরও বহু উদাহরণ রয়েছে। বাংলাদেশেও আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে কটাক্ষ করার অভিযোগে এক পাকিস্তানি উপরাষ্ট্রদূতকে এবং জঙ্গিদের অর্থায়নের অভিযোগে পাকিস্তানের একজন প্রথম সচিবকে বহিষ্কার করা হয়েছিল।

১৯৬৪ সালে কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর ভিয়েনা কনভেনশন নামে যে আন্তর্জাতিক চুক্তি হয়েছিল, সেটিই যে কূটনৈতিক সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণে প্রথম আন্তর্জাতিক সমঝোতা, তা নয়। ১৬৪৮ সালে ওয়েস্টফেলিয়া চুক্তিকে প্রথম চুক্তি হিসাবে বিবেচনা করা যেতে পারে, তবে তার আগেও দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে কূটনৈতিক সম্পর্কের নজির রয়েছে, যেগুলো প্রচলিত আন্তর্জাতিক আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতো। তেহরানে যুক্তরাষ্ট্রের কুটনীতিকদের ওপরে আক্রমণ মামলার রায়ে আন্তর্জাতিক আদালতে উল্লেখ করেন (১৯৭৯ সালের ডিসেম্বর) যে কূটনীতি সংক্রান্ত বিধানসমূহ প্রচলিত আন্তর্জাতিক আইনের (কাস্টমারি ইন্টারন্যাশনাল ল) নির্দেশনা হওয়ায় সকল রাষ্ট্র তা পালন করতে বাধ্য।

ভিয়েনা কনভেনশন কূটনীতিকদের কার্যাবলির তালিকা প্রকাশ করায় ধরে নেয়া যায় তালিকা বহির্ভূত কাজ করা কনভেনশনের খেলাপ। ওই অর্থে স্বাগতিক দেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলানো কনভেনশন বিরোধী বৈকি। তাছাড়া জাতিসংঘ সনদে অন্য দেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে যা মানতে কূটনীতিকগণ বাধ্য।

সুতরাং ছোট-বড়, ধনী-দরিদ্র কোনো দেশকেই ‘গরিবের বউ’ ভাবার অধিকার কোনো দেশের নেই। যারা এ ধরনের ধৃষ্টতা প্রদর্শন করে, তাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইন, ভিয়েনা কনভেনশন এবং জাতিসংঘ সনদের বিধান রয়েছে। এ সকল অনুশাসন মেনে চললে কোনো দেশ নিজেদেরকে অন্যদেশের ‘সম্রাট’ বা ‘ধনকুবের দেবর’ ভাবতে পারবে না।

আগেই বলেছি, হিরো আলমকে যারা প্রহার করেছে, বাংলাদেশের দক্ষ পুলিশ সিসি টিভির ছবি দেখে তাদের অনেককেই গ্রেপ্তার করেছে, যাদের অনেকেই রিমান্ডে রয়েছে। এ দেশের আইনের শাসন অনেক শক্তিশালী। এটা মগের মুলুক নয়। আর তাই ন্যায় বিচার হবেই, এটা নিশ্চিত করে বলা যায়। অনধিকার চর্চার আশ্রয় নিয়ে বিদেশিদের মাথা ঘামানোর দরকার নেই এবং সেটা বাঞ্ছনীয় নয়, গ্রহণযোগ্য নয়। এর ফলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন ঘটতে পারে, যা মোটেই কোনো সুফল বয়ে আনবে না।

এ বিষয়ে আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট রাষ্টদূতদের তলব করে বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক না গলানোর যে দাবি করেছেন, তা অত্যন্ত যথার্থ এবং আন্তর্জাতিক আইনকানুনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কোনো আত্মসম্মানবোধ-সম্পন্ন জাতিই এ ধরনের বাহ্যিক হস্তক্ষেপ মেনে নিতে পারে না।

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Saiful Islam is a journalist at Zoom Bangla News with seven years of experience in news writing and editorial work. He contributes to producing accurate, well-structured, and reader-focused content across digital platforms. His work reflects a strong commitment to editorial standards and responsible journalism.