রোগটি সম্পর্কে খুব কম সংখ্যক মানুষই জানেন। উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, এই পরজীবী সংক্রমিত রোগ ক্রমশ বদলাচ্ছে, কখনো কখনো শক্তিশালী হচ্ছে। এ ব্যাপারে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, স্নেইল ফিভার এখন বৈশ্বিক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যৌনাঙ্গ আক্রান্তকারী পরজীবী

Advertisement

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরজীবীটির গঠন ও বৈশিষ্ট্যে এমন কিছু পরিবর্তন এসেছে, যে কারণে নতুন নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে এর। আর এ ব্যাপারে এমন সময় সতর্কবার্তা এসেছে, যখন ৩০ জানুয়ারি ওয়ার্ল্ড নেগলেক্টেড ট্রপিক্যাল ডিজিজ ডে পালন করছে ডব্লিউএইচও। দিবসটির লক্ষ্য হচ্ছে ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, পরজীবী ও ছত্রাকজনিত রোগগুলোর দিকে দৃষ্টি দেয়া। যেগুলো সাধারণত দরিদ্র অঞ্চলে বসবাসরত শত কোটিরও অধিক মানুষকে আক্রান্ত করে।

স্নেইল ফিভার কী:
পরজীবীটি বহন করে এক ধরনের শামুক। এই বিশেষ ধরনের শামুক যেখানে বা যে পানিতে বসবাস করে, সেখানে এর লার্ভা বা শিশু পরজীবী বিস্তার করে। এ অবস্থায় কোনো ব্যক্তি যদি কোনোভাবে ওই পানির সংস্পর্শে আসে বা গোসল করতে যায়, তখন ব্যক্তিটি এই ফিভারে আক্রান্ত হতে পারেন। পরজীবীটির লার্ভাগুলো চামড়া গলিয়ে ফেলার মতো এনজাইম বিস্তার করে এবং তা ত্বকের ভেতর দিয়ে মানবদেহে প্রবেশ করে।

এরপর লার্ভাগুলো ধীরে ধীরে শরীরের ভেতর বড় হতে থাকে এবং তা পূর্ণবয়স্ক কৃমিতে পরিণত হয় ও পরবর্তীতে রক্তনালিতে বসবাস শুরু করে। আর স্ত্রী কৃমিগুলো ডিম পাড়তে থাকে। ডিমগুলোর কিছু কিছু মল বা প্রস্রাবের সঙ্গে শরীর থেকে নির্গত হয়। কিন্তু অনেক ডিম শরীরের ভেতরের টিস্যুতে আটকা থেকে যায়। ডিমগুলো আটকে গেলে শরীরের রোগ-প্রতিরোধ ব্যবস্থা সেসব ধ্বংস করতে গিয়ে আশপাশের এলাকার সুস্থ টিস্যুকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। এ কারণে বিভিন্ন অঙ্গের ক্ষতি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তবে কিছু ডিম তলপেট ও যৌনাঙ্গের আশপাশে আটকে থাকে। এই অবস্থাকে ইউরোজেনিটাল স্কিস্টোসোমিয়াসিস বলা হয়। এ ক্ষেত্রে পেটব্যথা থেকে শুরু করে মরণব্যাধী ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি থাকে এবং মারাত্মক ক্ষেত্রে মৃত্যুও হতে পারে।

ফিভারটি সাধারণত অ্যান্টি-প্যারাসাইটিক ওষুধে ঠিক হয়ে যায়। ডব্লিউএইচও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের যেমন- ছোট ছোট শিশু, কৃষিশ্রমিক ও জেলেদের এ ব্যাপারে গত কয়েক বছর ধরে পরামর্শ দিয়ে আসছেন, তারা যেন প্রতি বছরই এই ওষুধ খান। কিন্তু মালাউই লিভারপুল ওয়েলকাম ক্লিনিক্যাল রিসার্চ প্রোগ্রামের সহযোগী পরিচালক অধ্যাপক জানেলিসা মুসায়াসহ অন্যান্য বিজ্ঞানীরা বলছেন, স্নেইল ফিভারের নতুন কিছু ধরন পাওয়া গেছে, যেগুলো প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতিতে শনাক্ত না-ও হতে পারে।

গভীরে সংকট:
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বারবার একই জায়গায় ছড়াচ্ছে কেন এই রোগ? গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের শরীরে বসবাসরত পরজীবী আর প্রাণীর শরীরে উপস্থিত পরজীবী একে অপরের সঙ্গে মিলিত হয়ে নতুন ‘হাইব্রিড’ (মিশ্র) ধরন তৈরি করছে। আর হাইব্রিড পরজীবীগুলো মানুষ ও প্রাণী উভয়কেই আক্রান্ত করতে পারে। এ কারণে রোগের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ছে।

এ ব্যাপারে আগে থেকে বিজ্ঞানীরা জানতেন যে, মানুষ ও প্রাণীর শরীরের পরজীবীগুলো একে অপরের সঙ্গে প্রজনন করছে। তবে তারা নিশ্চিত ছিলেন না, এই হাইব্রিড ডিমগুলো শরীরের বাইরে বেঁচে থাকতে পারে কিনা। এটি প্রমাণ করার জন্য গবেষকরা মালাউইর কিছু নির্দিষ্ট এলাকার মানুষ ও প্রাণীর কাছ থেকে নমুনা সংগ্রহ করেন। তারা দেখতে পান, এসব পরজীবীর সাত শতাংশই ছিল পরিবর্তিত হাইব্রিড, যা ছিল তাদের ধারণার থেকেও অনেক বেশি। অর্থাৎ―নতুন পরজীবীগুলো সফলভাবে বংশবিস্তার করছে এবং যা ভবিষ্যতে অধিকতর ছড়িয়ে পড়বে।

অধ্যাপক মুসায়া বলেন, এভাবে যদি প্রকৃতিতে সংক্রমণ চলতেই থাকে, তাহলে সংখ্যাটা এক সময় বেশ বড় হয়ে যাবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, গবেষণা যেহেতু নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় করা হয়েছে, এ জন্য এটি হয়তো হিমশৈলের চূড়া মাত্র। কিন্তু মূল সমস্যা অনেক বড় হতে পারে। বিশেষ করে অনেক সময় যখন সংক্রমণটি পরীক্ষায় শনাক্তই হচ্ছে না। ভবিষ্যতে হাইব্রিড পরজীবীগুলো পুরনোদের হারিয়ে দিতে পারে বলে মনে করছেন।

তিনি বলেন, এটি একসময় বড় সমস্যা হতে পারে। কেননা, এখনো চিকিৎসকরা নিশ্চিত নন যে, এই হাইব্রিড পরজীবী বহন করা রোগীদের ঠিক কীভাবে চিকিৎসা প্রদান করতে হবে। নীতিনির্ধারকদের প্রতি আমাদের সতর্কবার্তা যে, সচেতন হোন। সমস্যাটি বড় হওয়ার আগেই দ্রুত কিছু করা যায় কিনা।

পরীক্ষায় যৌনাঙ্গের সংক্রমণ শনাক্ত হচ্ছে না:
গবেষণায় দেখা গেছে, হাইব্রিড পরজীবীগুলো মানুষের যৌনাঙ্গেও সংক্রমণ ঘটাচ্ছে। কিন্তু তা শনাক্ত করা কঠিন। কেননা, হাইব্রিড স্নেইল ফিভারের ডিম মাইক্রোস্কোপে সাধারণ পরজীবীর ডিমের মতো দেখায় না। কখনো কখনো স্বাস্থ্যকর্মীরা উপসর্গগুলোকে যৌনবাহিত রোগ মনে করে ভুল করতে পারেন। চিকিৎসা না হলে ইউরোজেনিটাল স্কিস্টোসোমিয়াসিস থেকে যৌনাঙ্গে ক্ষত, বন্ধ্যত্ব এবং এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আর নারীদের ক্ষেত্রে রোগটির শারীরিক, সামাজিক ও সন্তান ধারণসংক্রান্ত প্রভাব অধিক গুরুতর বলে মনে করা হয়।

অধ্যাপক মুসায়া বলেন, ভাবুন তো, কোনো নারী যদি সন্তান ধারণ করতে না পারেন… আমাদের সংস্কৃতিতে সন্তান হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। সন্তান না হলে ওই নারীকে নানাভাবে কটূক্তি করেন মানুষরা। যা খারাপ এবং খুবই কষ্টের একটি রোগ।

চাপের মুখে অগ্রগতি:
বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, হাইব্রিড পরজীবীগুলো নতুন নতুন এলাকায় স্নেইল ফিভার ছড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন, ভ্রমণ ও মানুষের অভিবাসনের জন্য ছড়াতে পারে ফিভারটি। আর হাইব্রিড পরজীবী থাকলে রোগটি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এরইমধ্যে দক্ষিণ ইউরোপের কিছু অঞ্চলে এ ধরনের হাইব্রিড সংক্রমণের খবর পাওয়া গেছে।

ডব্লিউএইচও’র স্কিস্টোসোমিয়াসিস নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির প্রধান ডা. আমাদু গারবা জিরমে বলেছেন, রোগটি একটি বৈশ্বিক উদ্বেগ। সংস্থাটি আশঙ্কা করছে, এর কারণে রোগ নির্মূলের লক্ষ্য ব্যাহত হতে পারে। তিনি বলেন, কিছু দেশে অবশ্য মানুষের মধ্যে রোগটির সংক্রমণ নেই। তবে প্রাণীদের শরীরে রয়ে গেছে পরজীবীটি। ভবিষ্যতে সেটাই ঝুঁকির কারণ হতে পারে মানুষের জন্য।

অক্ষয়ের ছেলের প্রেমজীবন নিয়ে চিন্তায় টুইংকেল

এদিকে নতুন হুমকি মোকাবিলার জন্য নিজেদের কৌশল বদলাচ্ছে ডব্লিউএইচও। সংস্থাটি চলতি বছর প্রাণীদের মধ্যে রোগ নিয়ন্ত্রণের জন্য কিছু নতুন নির্দেশনা দেবে। এরইমধ্যে বিভিন্ন দেশকে হাইব্রিড পরজীবী নিয়ে আন্তর্জাতিক সতর্কবার্তাও দেয়া হয়েছে। বিশাল আকারে অ্যান্টি-প্যারাসাইটিক ওষুধ বিতরণ কর্মসূচির জন্য ২০০৬ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ফিভারটির সংক্রমণ ৬০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। আর অগ্রগতিটি ধরে রাখার জন্য নিয়মিত অর্থায়ন প্রয়োজন। সংস্থাটি আরও বলছে, ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে উপেক্ষিত ট্রপিক্যাল রোগ খাতে সহায়তার পরিমাণ ৪১ শতাংশ কমেছে, যা এক ধরনের হুমকি।

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Md Elias is a journalist at Zoom Bangla News, contributing to news writing and editorial support. He is involved in refining content to ensure accuracy, clarity, and consistency across digital platforms. His work reflects a commitment to responsible journalism and reader-focused reporting.