প্রযুক্তির এই যুগে মানুষ এখন অনেক কাজেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর নির্ভর করছে। ইমেইল লেখা থেকে শুরু করে ভ্রমণের পরিকল্পনা, এমনকি একাকীত্বের সময় মনের কথা বলার সঙ্গী হিসেবেও অনেকে এখন এআই ব্যবহার করছে। বিশেষ করে রাতের নির্জন সময়ে যখন কারও সঙ্গে কথা বলার মতো কেউ থাকে না, তখন চ্যাটবক্সে নিজের অনুভূতি লিখে ফেলা অনেকের জন্য স্বস্তির বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে প্রশ্ন থেকে যায়—এই স্বস্তি কি আসলেই মানসিক থেরাপির বিকল্প হতে পারে?

কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট দামিনী গ্রোভার জানান, এআই আমাদের অনুভূতিগুলোকে গুছিয়ে প্রকাশ করতে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু মানসিক সুস্থতার জন্য মানুষের সঙ্গে সংযোগের বিকল্প নেই। মানুষের অনুভূতি, সহানুভূতি এবং বাস্তব সম্পর্ক—এসবই মানসিক সুস্থতার মূল ভিত্তি।
বিশ্বজুড়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নেওয়ার বিষয়ে এখনও অনেক মানুষ সচেতন নয়। উন্নয়নশীল দেশে প্রশিক্ষিত থেরাপিস্টের ঘাটতি এবং চিকিৎসার উচ্চ ব্যয়ের কারণে অনেকেই পেশাদার সহায়তা নিতে পারেন না। ফলে সহজলভ্য ও সবসময় ব্যবহারযোগ্য হওয়ার কারণে এআই অনেকের কাছে একটি বিকল্প সহায়ক হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
এআই-এর অন্যতম সুবিধা হলো এটি সারাক্ষণই পাওয়া যায়। এটি ক্লান্ত হয় না, বিরক্ত হয় না এবং নির্দিষ্ট সময়ের সীমাবদ্ধতাও নেই। ব্যবহারকারী যেকোনো সময় নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারেন। এটি সেই অনুভূতিগুলোকে বিশ্লেষণ করে সাজিয়ে দেয়, মানসিক অবস্থা বুঝতে সাহায্য করে এবং জার্নালিং বা রিল্যাক্সেশন চর্চার পরামর্শও দেয়। ফলে অনেকেই এটিকে মানসিক সহায়তার প্রথম ধাপ হিসেবে বেছে নিচ্ছে, বিশেষ করে যারা সরাসরি থেরাপিস্টের কাছে যেতে সংকোচ বোধ করেন।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, এখানে সীমা থাকা প্রয়োজন। সাইকোলজিস্ট দামিনী গ্রোভার বলেন, মানসিক স্বাস্থ্য কেবল তথ্য বা পরামর্শ পাওয়ার বিষয় নয়, এটি গভীরভাবে সম্পর্কের সঙ্গে জড়িত। জীবনের অনেক মানসিক আঘাত সম্পর্ক থেকেই আসে, এবং সেগুলো সারাতেও প্রয়োজন হয় মানুষের সংযোগ। এআই হয়তো ভালো কথা বলতে পারে, কিন্তু একজন মানুষের মতো অনুভব করতে পারে না।
একজন থেরাপিস্ট শুধু কথা শোনেন না, বরং কণ্ঠস্বরের পরিবর্তন, আচরণ, বিরতি—এসবও পর্যবেক্ষণ করেন। সময়ের সঙ্গে তিনি রোগীর মানসিক অবস্থার প্যাটার্ন বুঝতে পারেন, যা একটি যন্ত্রের পক্ষে সম্ভব নয়। এছাড়া থেরাপিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ‘কো-রেগুলেশন’, যেখানে একজন শান্ত ও সচেতন মানুষের উপস্থিতিতে আমাদের স্নায়ুতন্ত্রও স্থিতিশীল হয়। যাদের সম্পর্কজনিত ট্রমা বা নিরাপত্তাহীনতা রয়েছে, তাদের জন্য এই অভিজ্ঞতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এআই এই ধরনের আবেগগত নিরাপত্তা দিতে পারে না। এটি অনুভূতিকে স্বীকৃতি দিতে পারে, কিন্তু সেই অনুভূতির সঙ্গে “থাকতে” পারে না। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, গুরুতর মানসিক সমস্যা বা আত্মহত্যার ঝুঁকির ক্ষেত্রে এআই কোনো ক্লিনিক্যাল সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম নয়।
সব মিলিয়ে, এআই মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে একটি সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে—এটি মানুষকে সচেতন করে, অনুভূতি প্রকাশে সাহায্য করে এবং প্রাথমিকভাবে সাহস জোগায়। কিন্তু এটি কখনোই একজন পেশাদার থেরাপিস্টের জায়গা নিতে পারে না। কারণ মানসিক সুস্থতা শুধু বোঝার বিষয় নয়, এটি অনুভব করা এবং একজন মানুষের সঙ্গে গভীর সংযোগের মধ্য দিয়েই তা পূর্ণতা পায়।
সূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


