সাইফুল ইসলাম : মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার সোনাবাজু বেড়িবাঁধ সংলগ্ন চেগাড়ঘোনা এলাকায় এক যুবকের রহস্যজনক মৃত্যুকে ঘিরে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। নিহতের পরিবার, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও এলাকাবাসীর অভিযোগ— ঘটনাটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হলেও মানিকগঞ্জ সদর থানার ওসি মো. ইকরাম হোসেন সেটিকে “সড়ক দুর্ঘটনা” হিসেবে আড়াল করার চেষ্টা করেছেন। একই সঙ্গে সন্দেহভাজন পক্ষের সঙ্গে গোপন বৈঠক, উৎকোচ গ্রহণ, হত্যা মামলা নিতে গড়িমসি এবং ভিকটিম পরিবারের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে।

নিহত ব্যক্তির নাম মো. আমিনুল ইসলাম (৩৫)। তিনি , পিতা- আবুল হোসেন, মাতা- আঙ্গুরী বেগম। তার গ্রামের বাড়ি মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার ধূলসোড়া ইউনিয়নের কমলাপুর গ্রামের আবুল হোসেনের ছেলে। তবে তিনি সদর উপজেলার আইলকুন্ডি কলোনি সরকারি আশ্রয়ন প্রকল্প কেন্দ্র-২ এলাকায় বসবাস করতেন।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ২৩ এপ্রিল দিবাগত রাতে সোনাবাজু বেড়িবাঁধ এলাকার চেগাড়ঘোনা অংশে আমিনুল ইসলামের মরদেহ উপুড় অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে পুলিশে খবর দেয় স্থানীয়রা। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে।
ঘটনার সংবাদ পেয়ে নিহতের স্বজন ও স্থানীয় ব্যক্তিরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। এসময় মানিকগঞ্জ সদর থানার ওসি মো. ইকরাম হোসেন পুলিশ সদস্যদের নিয়ে ঘটনাস্থলের পাশের একটি বাড়িতে প্রবেশ করেন। ওই বাড়ির মালিক আমিনুল ইসলাম স্থানীয়ভাবে “ইয়াবা আমিনুল” নামে পরিচিত বলে জানা গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ওসি প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে সন্দেহভাজন আমিনুল ইসলামের বাড়ির ভেতরে আমিনুল ইসলামের স্ত্রী বীনা আক্তার ও স্থানীয় ইউপি সদস্য বিল্লাল হোসেনের সঙ্গে একান্তে অবস্থান করেন। এসময় বাইরে উপস্থিত লোকজনকে অপেক্ষা করতে বলা হয়।
পরে ওসি বের হয়ে নিহতের পরিবারকে জানান, এটি একটি “রোড এক্সিডেন্ট” এবং এ ঘটনায় সড়ক দুর্ঘটনা আইনে মামলা করতে হবে। নিহতের স্বজনদের অভিযোগ, তারা হত্যার আশঙ্কার কথা জানালেও পুলিশ তাদের সড়ক দুর্ঘটনার মামলা করতে চাপ দেয়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঘটনার কয়েক ঘণ্টা আগে ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জ থানাধীন সোনাবাজু বেড়িবাঁধ বাজার এলাকা থেকে বারোয়াখালী পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের এসআই ফেরদৌস হোসেন, এসআই জগন্নাথ ও এএসআই আব্দুস সালামসহ একটি টিম নিহত আমিনুল ইসলাম ও সন্দেহভাজন আমিনুল ইসলামকে আটক করে। স্থানীয় একটি সেলুনের মালিক চন্দন চন্দ্রবংশীর ভাষ্য অনুযায়ী, আটক হওয়ার কিছুক্ষণ পর সন্দেহভাজন আমিনুল ইসলামের স্ত্রী বীনা আক্তার সেখানে উপস্থিত হন। পরে পুলিশ সদস্যরা সেলুনের ঝাঁপ বন্ধ করে প্রায় দেড় ঘণ্টা ভেতরে অবস্থান করেন। পরবর্তীতে দুইজনকেই ছেড়ে দেওয়া হয়।
স্থানীয়রা জানান, রাত ১০টার দিকে দুইজনকে একসঙ্গে হেঁটে যেতে দেখা যায়। অথচ পরদিন ভোরে বেড়িবাঁধ সংলগ্ন পুকুরপাড় থেকে নিহত আমিনুল ইসলামের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
নিহতের স্বজনদের দাবি, মরদেহে শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন, কামড়ের দাগ এবং অণ্ডকোষ থেঁতলানোর আলামত ছিল। তবে বাইরে উল্লেখযোগ্য রক্তক্ষরণ ছিল না। এত গুরুতর আলামত থাকার পরও শুরু থেকেই পুলিশ ঘটনাটিকে সড়ক দুর্ঘটনা হিসেবে প্রচার করতে থাকে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত একাধিক ব্যক্তি জানান, সন্দেহভাজন আমিনুল ইসলামের স্ত্রী বীনা আক্তার মরদেহ উদ্ধারের সময় নিহতকে চিনতে না পারার ভান করেন। অথচ নিহত আমিনুল ইসলাম দীর্ঘদিন তাদের বাড়িতে কাজ করতেন।
নিহতের পিতা-মাতা ও স্বজনরা যখন সড়ক দুর্ঘটনার বিষয়টি মানতে অস্বীকৃতি জানান, তখন পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে তাদের বাকবিতণ্ডা হয়। এসময় মানিকগঞ্জ সদর থানার এসআই জিয়াউদ্দিন ভিকটিম পরিবারের সদস্যদের ধাক্কাধাক্কি ও অসদাচরণ করেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
পরদিন মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। পরিবারের অভিযোগ, ময়নাতদন্ত শেষে লাশ বুঝে নিতে গেলে পুলিশ, ডোম ও হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা খরচের কথা বলে ৪৫ হাজার টাকা দাবি করেন। স্বজনরা ৯ হাজার টাকা দিতে রাজি হলেও তাদের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হয়নি। একইসঙ্গে সড়ক দুর্ঘটনা মামলায় স্বাক্ষর করতে চাপ দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন তারা।
পরিবার রাজি না হওয়ায় তারা লাশ ছাড়াই বাড়ি ফিরে যান। পরে আবারও লাশ নিতে গেলে একই ধরনের চাপ সৃষ্টি করা হয়। একপর্যায়ে পরদিন গভীর রাতে হরিরামপুর ও মানিকগঞ্জ সদর থানা পুলিশের সদস্যরা স্থানীয় দফাদার ও গ্রাম পুলিশের সহায়তায় মরদেহ দাফন করে বলে অভিযোগ উঠেছে।
নিহতের পরিবার জানায়, বিভিন্ন মহলে যোগাযোগের পর তাদের থানায় গিয়ে মামলা করার পরামর্শ দেওয়া হয়। পরে ২৬ এপ্রিল তারা মানিকগঞ্জ সদর থানায় গেলে ওসি ইকরাম হোসেন প্রথমে তাদের দীর্ঘসময় অপেক্ষা করান। পরে তার কক্ষে গেলে তিনি ক্ষুব্ধ আচরণ করে বলেন, “আপনারা কী চান? এটা তো দুর্ঘটনা। কাউকে হত্যা করতে দেখেছেন? তাহলে কার নামে মামলা নেব?”
পরিবারের সদস্যরা হত্যার অভিযোগে মামলা নিতে অনুরোধ করলেও ওসি পুনরায় সড়ক দুর্ঘটনার মামলা করার জন্য চাপ দেন বলে অভিযোগ করেন তারা। এদিকে নিহতের পিতা-মাতার দাবি, একইদিন তারা সন্দেহভাজন আমিনুল ইসলামকে পুলিশ সুপারের কার্যালয় এলাকা থেকে বের হয়ে যেতে দেখেছেন।
স্থানীয়দের দাবি, বারোয়াখালী পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের কয়েকজনপুলিশ কর্মকর্তা একই রাতে দুইজনকে আটক করেছিল। পরবর্তীতে নিহত ব্যক্তি মারা গেলেও জীবিত থাকা অপর ব্যক্তিকে গুরুত্ব সহকারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি। বরং পুলিশের আচরণ শুরু থেকেই সন্দেহজনক ছিল।
এলাকাবাসীর ধারণা, কোনো গোপন লেনদেন বা দ্বন্দ্বের জেরে আমিনুল ইসলাম হত্যার শিকার হতে পারেন। পরে ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে এটিকে সড়ক দুর্ঘটনা হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে।
এ বিষয়ে বারোয়াখালী পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের এসআই ফেরদৌস হোসেন বলেন, “আমি এ বিষয়ে কিছুই জানি না। এমনকি তাদের চিনিও না, তারাও আমাকে চেনে না। ঘটনাস্থলে এসআই জগন্নাথ ছিলেন। তিনি বিষয়টি বিস্তারিত বলতে পারবেন।”
পরে এসআই জগন্নাথের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আমরা সোনাবাজু বাজার এলাকা দিয়ে যাওয়ার সময় বেশ কিছু লোকজনকে জড়ো হয়ে চিৎকার-চেঁচামেচি করতে দেখে সেখানে যাই। পরে জানতে পারি, পাওনা টাকা নিয়ে দুইজনের মধ্যে বিরোধ চলছে। এরপর বাজারের মধ্যে ঝামেলা করতে নিষেধ করে আমরা সেখান থেকে চলে আসি। কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি। পরে কি হয়েছে সেটাও জানা নেই।”
এ বিষয়ে মানিকগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইকরাম হোসেন বলেন, “মরদেহের পিঠে গাড়ির চাকার দাগ দেখে প্রাথমিকভাবে এটি সড়ক দুর্ঘটনা বলে মনে হয়েছে। মরদেহে অন্য কোনো আঘাত বা জখমের চিহ্ন ছিল কি না, সেটি সুরতহাল রিপোর্ট প্রস্তুতকারী কর্মকর্তা ভালো বলতে পারবেন। তবে পোস্টমর্টেম রিপোর্ট পাওয়ার পর যদি হত্যাকাণ্ডের আলামত পাওয়া যায়, তাহলে সে অনুযায়ী হত্যা মামলা গ্রহণ করা হবে।”
তিনি আরও বলেন, “পরিবারের কাছে মরদেহ হস্তান্তরের জন্য পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো টাকা দাবি করা হয়নি। শুনেছি, ডোম লাশ গোসল ও কাফনের খরচ বাবদ কিছু টাকা চেয়েছিল। তবে এর সঙ্গে পুলিশের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। মর্গ থেকে পরিবারের কাছে মরদেহ হস্তান্তরের সময় পরিবারের একজন সদস্য কাটা মরদেহ দেখে বমি করে অজ্ঞান হয়ে যান। এ কারণে তারা লাশ না নিয়েই চলে যান। পরে ডোম হরিরামপুর থানা পুলিশের সহযোগিতায় পরিবারের কাছে মরদেহ পৌঁছে দেয়।”
এ বিষয়ে মানিকগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (বিশেষ শাখা) আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, “বিষয়টি আমার জানা নেই। প্রকৃত ঘটনা কী, তা খোঁজখবর নিয়ে দেখব।”
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।



