যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সাথে চলমান সংঘাতের দুই মাস পূর্ণ হওয়ার মাথায় ইরান চরম হুঁশিয়ারি বার্তা প্রদান করেছে। বৃহস্পতিবার তেহরান জানিয়েছে, ওয়াশিংটন যদি নতুন করে হামলা চালায়, তবে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন অবস্থানগুলোর ওপর দীর্ঘস্থায়ী ও যন্ত্রণাদায়ক পাল্টা আঘাত হানা হবে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালীর ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়ে ইরান বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করেছে। চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে জ্বালানি তেলের দাম।

বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। গত দুই মাস ধরে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি বন্ধ থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম যুদ্ধের শুরুর তুলনায় দ্বিগুণ হয়ে এক পর্যায়ে ব্যারেল প্রতি ১২৬ ডলারে পৌঁছেছিল, যা বর্তমানে ১১৩ ডলারের আশেপাশে স্থিতিশীল রয়েছে।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সতর্ক করে বলেছেন, এই অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে এবং কোটি কোটি মানুষ দারিদ্র্য ও চরম ক্ষুধার মুখে পড়বে।
সামরিক উত্তেজনা ও মার্কিন পরিকল্পনা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বৃহস্পতিবার ইরানের ওপর নতুন সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা নিয়ে একটি ব্রিফিং গ্রহণ করার কথা রয়েছে। এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো ইরানকে আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য করা। এমনকি হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত করতে মার্কিন স্থলবাহিনী ব্যবহারের বিকল্পও বিবেচনা করা হচ্ছে। অন্যদিকে, ইরানের অ্যারোস্পেস ফোর্সের কমান্ডার মাজিদ মুসাভি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, এর আগে যেমন মার্কিন আঞ্চলিক ঘাঁটিগুলোতে আঘাত হানা হয়েছে, এবার তাদের যুদ্ধজাহাজগুলোর ক্ষেত্রেও একই পরিণতি হবে।
হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের অনড় অবস্থান
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি এক লিখিত বার্তায় জানিয়েছেন, তার দেশ এই জলপথের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবে। তিনি বহিরাগত শক্তিগুলোকে এই অঞ্চল ত্যাগের নির্দেশ দিয়ে বলেন, হাজার হাজার কিলোমিটার দূর থেকে আসা বিদেশিদের জন্য এই জলপথের তলদেশ ছাড়া আর কোনো জায়গা নেই। ইরান বর্তমানে তাদের তেল রপ্তানির ওপর মার্কিন অবরোধের পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে এই প্রণালীটি বন্ধ করে রেখেছে।
কূটনৈতিক স্থবিরতার পরেও চলছে মধ্যস্থতা
বর্তমানে যুদ্ধের ময়দানে গত ৮ এপ্রিল থেকে একটি যুদ্ধবিরতি চললেও স্থায়ী সমাধানের পথে কোনো অগ্রগতি হয়নি। পাকিস্তান বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে। ট্রাম্পের দাবি হলো আলোচনার শুরুতেই ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ফয়সালা করতে হবে, অন্যদিকে ইরান চায় আগে যুদ্ধ শেষ হোক এবং নৌ-চলাচলের বিষয়টি সমাধান হোক।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি এবং জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মার্জ ইরানকে কূটনীতির পথে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান স্পষ্ট করেছেন, ওয়াশিংটন তাদের আচরণ পরিবর্তন করলেই শুধু তেহরান পুনরায় কূটনীতির পথে হাঁটবে।
আঞ্চলিক ক্ষয়ক্ষতি ও অবকাঠামো
এই যুদ্ধে ইরানের ভেতরে এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অংশে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এমনকি আমাজনের মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলো জানিয়েছে যে, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে তাদের ক্লাউড অঞ্চলের অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে কয়েক মাস সময় লেগে যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে ‘ম্যারিটাইম ফ্রিডম কনস্ট্রাক্ট’ নামে একটি নতুন কোয়ালিশন গঠনের চেষ্টা করছে যাতে যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখা যায়, যদিও ফ্রান্স ও ব্রিটেন যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এতে অংশ নিতে দ্বিধা প্রকাশ করেছে।
আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে
সামগ্রিকভাবে, ইরানের অনড় অবস্থান এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতির ফলে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এক অনিশ্চিত ও ভয়াবহ পরিণতির দিকে ধাবিত হচ্ছে, যার প্রভাব বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় অনুভূত হচ্ছে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


