নতুন সরকার এক কঠিন সামষ্টিক অর্থনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে দায়িত্ব নিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান।

বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টার ইন অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে তিনি একথা বলেন।
তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, “অর্থনীতির ভঙ্গুর স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের স্থবিরতা এবং সংকুচিত রাজস্ব পরিসর—এই তিন বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই সরকারকে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পথে এগোতে হবে।”
‘নতুন সরকারের জন্য সামষ্টিক অর্থনীতির বেঞ্চমার্ক’ শীর্ষক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয় এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম, বাংলাদেশ-এর উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে।
সামষ্টিক অর্থনীতির তিন প্রধান বাধা
সিপিডির বিশ্লেষণে বলা হয়, বৈশ্বিক বাজারে মূল্যস্ফীতি নিম্নমুখী হলেও বাংলাদেশে এর প্রতিফলন এখনও সীমিত। বিশেষ করে খাদ্য বহির্ভূত মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে থাকায় সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় চাপে রয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে কিছুটা উন্নতি এলেও আমদানি চাহিদা বৃদ্ধি ও বাণিজ্যিক ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়লে এই স্থিতিশীলতা টেকসই নাও থাকতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।
দ্বিতীয়ত, বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে স্থবিরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ২০২৫ অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ২২ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে এসেছে, যা সাম্প্রতিক বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। একই সময়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশে সীমিত হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৫ অর্থবছরের প্রথমার্ধে প্রায় ২১ লাখ মানুষ কর্মসংস্থান হারিয়েছে।
তৃতীয়ত, দেশের রাজস্ব কাঠামো গভীর চাপে রয়েছে। অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আয় দিয়ে সরকারের দৈনন্দিন পরিচালন ব্যয় মেটানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে ঋণ পরিশোধে নতুন ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। ২০২৫ ও ২০২৬ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
দশ দফা নীতিগত সুপারিশ
বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সিপিডি ১০টি নীতিগত সুপারিশ তুলে ধরে। এর মধ্যে রয়েছে—মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি হার সামান্য কমানো; বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় সক্রিয়তা বৃদ্ধি; টাকার বিনিময় হার ধীরে ধীরে সমন্বয় করা;
রপ্তানি ও প্রবাস আয়ে নগদ প্রণোদনা যৌক্তিকীকরণ; সরকারি ব্যয়ে মিতব্যয়িতা এবং লোকসানি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তি; পাচার হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধার ও খেলাপি ঋণ আদায়ে আইনি ও কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার।
নির্বাচনি অঙ্গীকার কতটা বাস্তবসম্মত?
প্রতিবেদনে নতুন সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষিত ১০টি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতির বাস্তবতা যাচাই করা হয়। ২০৩৪ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের জিডিপি অর্জনকে ‘অর্জনযোগ্য’ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও, জিডিপির ১৫ শতাংশ রাজস্ব আদায় বা বৈদেশিক বিনিয়োগ জিডিপির ২ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যকে ‘অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী’ বলা হয়েছে।
স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হলে শক্তিশালী রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও রাজস্ব কাঠামোয় আমূল সংস্কার প্রয়োজন বলে মত দেন গবেষকরা। একই সঙ্গে বন্ধ বা একীভূত হওয়া ইসলামিক ব্যাংকগুলোর আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রশ্নে সরকারের সম্ভাব্য আর্থিক দায়ের বিষয়টিও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়। এ খাতে বছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে বলে ধারণা দেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে
বাস্তবসম্মত বাজেটের আহ্বান
সিপিডি মনে করে, বর্তমান বাস্তবতায় ২০২৫ অর্থবছরের জন্য একটি বাস্তবসম্মত সংশোধিত বাজেট প্রণয়ন জরুরি। পাশাপাশি ২০২৭ অর্থবছরের জন্য একটি বিশ্বাসযোগ্য আর্থিক কাঠামো নির্ধারণ এবং মধ্যমেয়াদি সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে। অন্যথায় সামষ্টিক অর্থনীতির ভঙ্গুরতা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়।
অনুষ্ঠানে অর্থনীতিবিদ, গবেষক, নীতিনির্ধারক ও গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


