বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সমন্বয়ে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে নতুন এক যুগের সূচনা হয়েছে। মহাকাশে স্থাপিত কৃত্রিম উপগ্রহের মাধ্যমে প্রাণীদের আচরণ ও গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য ‘ইকারুস’ নামে একটি আধুনিক স্যাটেলাইট ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রাণীদের ভীতিকর পরিস্থিতিতে প্রতিক্রিয়ার ধরন বিশ্লেষণ করে তাদের সুরক্ষায় কাজ করা হচ্ছে। বিশেষ করে আফ্রিকার বিপন্ন চিতা, গণ্ডার ও হাতির মতো প্রাণীদের চোরাশিকারিদের হাত থেকে রক্ষা করাই এর মূল লক্ষ্য।

দক্ষিণ আফ্রিকার নামিবিয়ার ওকাম্বারা নামের একটি বেসরকারি বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এলাকায় এই প্রযুক্তির কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়েছে। অঞ্চলটি শুষ্ক ও ঝোপঝাড়ে ভরা, যেখানে বন্যপ্রাণীরা স্বাভাবিকভাবেই সবসময় সতর্ক অবস্থায় থাকে। গবেষণার সময় একদল গবেষক ছদ্মবেশে শিকারির মতো আচরণ করে প্রাণীদের প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করেন।
এই পরীক্ষার সময় ফাঁকা গুলি ছোড়ার ফলে প্রাণীদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। জেব্রা ও ওয়াইল্ডবিস্ট দিকবিদিক জ্ঞান হারিয়ে পালাতে শুরু করে, তবে জিরাফ তুলনামূলকভাবে শান্ত থেকে দূর থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে। একটি ড্রোনের মাধ্যমে এসব প্রাণীর আতঙ্কিত হওয়ার নির্দিষ্ট চলাচলের ধরণ রেকর্ড করা হয়।
এই কৃত্রিম পরিস্থিতির মূল উদ্দেশ্য ছিল বাস্তব শিকারি উপস্থিত হলে প্রাণীরা কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানায় তা বোঝা। সংগৃহীত তথ্য একটি বিশেষ কম্পিউটার অ্যালগরিদমকে প্রশিক্ষণ দিতে ব্যবহার করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে বনে চোরাশিকারি প্রবেশ করলে প্রাণীদের আচরণের এই ধরণ শনাক্ত করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে রক্ষীদের সতর্কবার্তা পাঠানো হবে।
এই ব্যবস্থার প্রধান ভিত্তি হলো প্রাণীদের শরীরে সংযুক্ত ক্ষুদ্র জিপিএস ট্যাগ ও সেন্সর। জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা এই প্রযুক্তি উন্নয়নে কাজ করছেন। ওকাম্বারা পার্কের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বড় প্রাণীর শরীরে এই ট্যাগ বসানো হয়েছে, যা তাদের অবস্থান ছাড়াও হৃদস্পন্দন, শরীরের তাপমাত্রা ও পরিবেশগত তথ্য সরবরাহ করতে পারে।
বিজ্ঞানীরা এই ধারণাকে ‘ইন্টারনেট অব অ্যানিম্যালস’ নামে অভিহিত করেছেন। এর মাধ্যমে প্রাণীদের চলাচলের তথ্য বিশ্লেষণ করে শিকারিদের অবস্থান শনাক্ত করার একটি সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হচ্ছে।
ইতিমধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রুগার ন্যাশনাল পার্কে এই প্রযুক্তির প্রাথমিক ব্যবহার ইতিবাচক ফল দিয়েছে। বড় এলাকায় চোরাশিকার প্রতিরোধে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারছে। ভবিষ্যতে আরও বেশি প্রাণীকে এই নেটওয়ার্কের আওতায় এনে একটি সমন্বিত পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
বর্তমানে মহাকাশে একাধিক উপগ্রহ স্থাপন করা হয়েছে, যা পৃথিবীর যেকোনো স্থান থেকে বন্যপ্রাণীর তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করতে সক্ষম। এই প্রযুক্তি শুধু চোরাশিকার রোধেই নয়, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে প্রাণীদের জীবনধারা বোঝা ও সংরক্ষণ কার্যক্রমেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।



