জাহিদ ইকবাল: নিজ দলের এমন বিজয় দেখা হলো না আপসহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার। এই একটি বাক্যের মধ্যেই যেন জমাট বেঁধে আছে কয়েক দশকের রাজনৈতিক সংগ্রাম, রক্ত-ঘাম-অশ্রুতে লেখা ইতিহাস, আর এক অসম্পূর্ণ আনন্দের গভীর দীর্ঘশ্বাস।

আপসহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া

Advertisement

বিজয় এসেছে, পতাকা উড়েছে, স্লোগানে কেঁপেছে জনপদ—কিন্তু যাঁর কণ্ঠে একসময় এই স্লোগান প্রাণ পেয়েছিল, যাঁর ডাকেই রাজপথ ভরে উঠেছিল—তিনি নেই সেই দৃশ্যে। ইতিহাস কখনও কখনও এভাবেই নির্মম হয়; অর্জনের মুহূর্তে রেখে যায় শূন্যতার দাগ। বাংলাদেশের নব্বই-পরবর্তী গণতান্ত্রিক রাজনীতির মানচিত্র আঁকতে গেলে তাঁর নাম এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে রাজপথের যে কয়েকটি মুখ মানুষের মনে সাহস জুগিয়েছে, তিনি ছিলেন তাদের অন্যতম। ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তনের পর দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ—এটি কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনা ছিল না, ছিল সামাজিক মনস্তত্ত্বে এক বড় পরিবর্তনের সূচনা। এরপর ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে আবারও সরকার পরিচালনা—এই ধারাবাহিকতা তাঁকে দেশের ইতিহাসে অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক নেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

তাঁর রাজনৈতিক জীবন ছিল সংঘাত, সমালোচনা, প্রতিরোধ ও প্রত্যাবর্তনের এক দীর্ঘ উপাখ্যান। ক্ষমতায় থেকেও বিতর্ক, বিরোধী দলে থেকেও চাপ—সবকিছুর মধ্য দিয়ে তিনি একটি বিষয় স্পষ্ট করেছেন: অবস্থানে দৃঢ়তা। সমর্থকদের কাছে তিনি “আপসহীন” শুধু একটি বিশেষণ নয়—একটি বিশ্বাসের নাম। বহু রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে সমঝোতার পথ খোলা থাকলেও তিনি দলীয় অবস্থান থেকে সরে আসেননি—এটি তাঁর অনুসারীদের কাছে নেতৃত্বের সততার প্রতীক হয়ে আছে।

রাজনৈতিক ভাষ্যকাররা বলেন, তাঁর নেতৃত্বের মূল শক্তি ছিল সংগঠনকে আবেগের সঙ্গে যুক্ত করতে পারা—রাজনীতিকে কেবল কৌশল নয়, আত্মপরিচয়ের অংশ বানানো।

দীর্ঘ সময় ধরে তিনি সক্রিয় রাজনীতির বাইরে। আইনি লড়াই, স্বাস্থ্যগত জটিলতা, প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা—সব মিলিয়ে তাঁর সরাসরি অংশগ্রহণ কমে যায়। তবু আশ্চর্যের বিষয়, মাঠের কর্মীরা তাঁকে ভুলে যায়নি। পোস্টার, ব্যানার, স্লোগান, সভা—সবখানেই তাঁর নাম ছিল অনুপস্থিত উপস্থিতির মতো। রাজনৈতিক সমাবেশে প্রায়ই শোনা গেছে—“নেত্রী মুক্তি পেলে আবার রাজপথে ফিরবে আন্দোলন।” অর্থাৎ তিনি শুধু একজন ব্যক্তি নন, এক চলমান প্রতীকে রূপ নিয়েছেন।

আজ যখন দল বিজয়ের স্বাদ পায়, তখন এই প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই ওঠে—এই পথের ভিত্তি কে গড়ে দিয়েছিলেন? একটি রাজনৈতিক সংগঠন রাতারাতি শক্তিশালী হয় না। বছরের পর বছর তৃণমূল বিস্তার, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা, রাজনৈতিক বার্তা তৈরি, ভোটব্যাংক নির্মাণ—এসবের পেছনে থাকে দীর্ঘ নেতৃত্ব। সেই বাস্তবতায় আজকের অর্জনের পেছনেও তাঁর সময়ের সিদ্ধান্ত, আন্দোলনের ধারা, সংগঠন গড়ার কৌশল গভীরভাবে জড়িত—এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই।

বিজয়ের দিন সাধারণত নিখাদ আনন্দের দিন। কিন্তু কিছু বিজয় আছে, যেগুলো আনন্দের ভেতরেও কাঁটার মতো খচখচ করে। মঞ্চে উল্লাস, কিন্তু চোখে জল। করতালি, কিন্তু কণ্ঠে ভার। কারণ মানুষ শুধু ফল দেখে না, যাত্রাপথও মনে রাখে। যারা বছরের পর বছর মামলা, হামলা, গ্রেপ্তার, দমন–পীড়নের ভেতর দলকে টিকিয়ে রেখেছে, তাদের কাছে এই বিজয় একদিকে স্বস্তি—অন্যদিকে স্মৃতি। তারা জানে, এই পথের শুরুতে যিনি সামনে ছিলেন, শেষের এই দৃশ্যে তিনি অনুপস্থিত।

রাজনীতির নির্মম সত্য হলো—সময় কারও জন্য অপেক্ষা করে না। নেতৃত্ব বদলায়, প্রজন্ম বদলায়, কৌশল বদলায়। কিন্তু কিছু নাম ইতিহাসে থেকে যায় ভিত্তি হিসেবে। আজকের নতুন নেতৃত্ব, নতুন কণ্ঠ, নতুন মুখ—সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ; তবু শেকড়ের কথা ভুলে গেলে গাছ টেকে না। তাই বিজয়ের উল্লাসে যেমন নতুনদের অভিনন্দন, তেমনি পুরনো নেতৃত্বের প্রতি কৃতজ্ঞতাও থাকা উচিত—এটাই রাজনৈতিক সংস্কৃতির সৌন্দর্য।

এই বিজয় তাই কেবল একটি নির্বাচনী ফল নয়—এটি স্মৃতি ও বাস্তবতার মিলিত বিন্দু। উপস্থিতির সঙ্গে অনুপস্থিতির সংলাপ। আনন্দের সঙ্গে বেদনার সহাবস্থান। ইতিহাস একদিন লিখবে—দল জিতেছিল, মানুষ উল্লাস করেছিল, কিন্তু একজন আপসহীন নেত্রী সেই দৃশ্যটি নিজ চোখে দেখে যেতে পারেননি।

আরও পড়ুনঃ

৩৫ বছর পর পুরুষ প্রধানমন্ত্রী পাচ্ছে বাংলাদেশ

বিজয়ের আলো তাই আজ একটু নরম, একটু কুয়াশাচ্ছন্ন। সেখানে উজ্জ্বলতা আছে—তবু কোথাও এক ফাঁকা চেয়ার, এক নীরব নাম, এক অদৃশ্য উপস্থিতি।

লেখক পরিচিতি: সিনিয়র সাংবাদিক ও সভাপতি বাংলাদেশ অনলাইন জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন।

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Tarek Hasan is a professional journalist and currently works as a sub-editor at Zoom Bangla News. With six years of experience in journalism, he is an experienced writer with a strong focus on accuracy, clarity, and editorial quality. His work contributes to delivering reliable and engaging news content to digital audiences.