জাহিদ ইকবাল: বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গত দেড় দশকের শাসনামল মানেই এক দুঃসহ অভিজ্ঞতার নাম।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালীন রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে যেভাবে পিষ্ট করেছে, তা কেবল অগণতান্ত্রিকই ছিল না, বরং ছিল চরম মানবাধিকার বিরোধী।

আওয়ামী লীগ বিএনপি

Advertisement

গুম, বিচারব্যবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং হাজার হাজার ‘গায়েবি মামলার’ এক ভয়ার্থ সংস্কৃতি দেশে কায়েম করা হয়েছিল, যার প্রধান লক্ষ্য ছিল বিরোধী কণ্ঠস্বরকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া।

বিশেষ করে বিএনপি ও তার অঙ্গসংগঠনের ওপর নেমে এসেছিল রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের স্টিম রোলার। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে ও পরে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের রাজপথ থেকে সরিয়ে দিতে জেল-জুলুম ও অমানবিক নির্যাতনের যে ভয়াবহ চিত্র আমরা দেখেছি, তা কোনো সভ্য দেশে কল্পনা করা যায় না। হাজার হাজার কর্মীকে বছরের পর বছর ঘরছাড়া করে রাখা হয়েছিল এবং সাধারণ মানুষকে রাজনৈতিক অধিকার থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত করা হয়েছিল।

আওয়ামী লীগ আমলে নির্বাচনী ব্যবস্থাকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। রাতের অন্ধকারে ব্যালট পেপারে সিল মারা, কেন্দ্র দখল এবং ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে জনগণের পবিত্র আমানত ‘ভোট’ চুরি করা হয়েছিল।

এতে কেবল একটি দল ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, বরং সাধারণ মানুষ তাদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও নীতিনির্ধারণী অধিকার থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তি এতে চরমভাবে ক্ষুণ্ণ হয়েছে।

প্রশাসনিক শক্তির নজিরবিহীন অপব্যবহার ছিল আওয়ামী লীগ আমলের সবচেয়ে বড় ক্ষত। পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দলীয় লাঠিয়াল বাহিনীতে রূপান্তর করার ফলে সাধারণ মানুষের শেষ আশ্রয়স্থলটুকুও হারিয়ে গিয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বারবার উল্লেখ করেছে যে, বিরোধী দলের গ্রেফতার, মামলা এবং সমাবেশে বাধা দেওয়া বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে পঙ্গু করে দিয়েছে।

এখন প্রশ্ন উঠছে, যে দল দীর্ঘকাল ধরে বিরোধী পক্ষকে নির্মূল করার চেষ্টা করেছে এবং অমানবিক নির্যাতন চালিয়েছে, সেই পতিত আওয়ামী লীগকে কেন রাজনৈতিক মাঠে ফেরার সুযোগ দেওয়া হবে? কেন বিএনপি বা অন্য বিরোধী শক্তিগুলো তাদের নিষিদ্ধ বা নিশ্চিহ্ন করার পথে না হেঁটে গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের কথা বলছে? এই প্রশ্নটি যেমন আবেগপ্রসূত, তেমনি এর উত্তর লুকিয়ে আছে দেশের দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার গভীরে।

আওয়ামী লীগ যে প্রতিহিংসার রাজনীতি বপন করেছিল, তার বিচার হতে হবে কঠোর আইনি প্রক্রিয়ায়। তাদের শাসনামলের প্রতিটি অপরাধ, দুর্নীতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। তবে রাজনৈতিকভাবে তাদের মোকাবিলা করার অর্থ এই নয় যে, তাদের মতো একই দমনমূলক পথ বেছে নিতে হবে। প্রতিহিংসার বদলে আইনের শাসন এবং বিচার বিভাগীয় প্রক্রিয়ায় তাদের কৃতকর্মের হিসাব নেওয়াটাই হবে প্রকৃত ন্যায়বিচার।

বিএনপি যদি বিশ্বাস করে যে দেশের জনগণের নিরঙ্কুশ সমর্থন তাদের সাথে আছে, তবে সমান মাঠে (Level Playing Field) লড়াই করাই হবে তাদের নৈতিক বিজয়। প্রতিপক্ষকে প্রশাসনিকভাবে নিষিদ্ধ করে বা মাঠ থেকে তাড়িয়ে দিয়ে নয়, বরং একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে জনগণের ভোটের মাধ্যমে তাদের প্রত্যাখ্যান করাই হবে প্রকৃত রাজনৈতিক বিজয়। আত্মবিশ্বাসী কোনো রাজনৈতিক শক্তি কখনও প্রতিপক্ষের ভয়ে ভীত হয়ে মাঠ ফাঁকা করতে চায় না।

আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক স্পেস দেওয়ার অর্থ তাদের অপরাধের দায়মুক্তি দেওয়া নয়। বরং এটি বিধ্বস্ত গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে পুনরায় জীবন্ত করার একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। এক পক্ষ যদি অন্য পক্ষকে রাজনৈতিকভাবে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করে, তবে দেশে কখনোই টেকসই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে না। প্রতিহিংসার যে বিষবৃক্ষ আওয়ামী লীগ রোপণ করেছে, তার উত্তর হতে হবে উদারতা ও গণতান্ত্রিক সহনশীলতা দিয়ে, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো দল এমন দুঃশাসন চালানোর সাহস না পায়।

একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বিএনপি যদি এই গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারে, তবে তা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা করবে। যেখানে রাজনৈতিক জয়-পরাজয় নির্ধারিত হবে কোনো বিশেষ বাহিনীর মদতে নয়, বরং জনগণের পবিত্র ব্যালটের মাধ্যমে। আওয়ামী লীগের দমন-পীড়নের বিপরীতে দাঁড়িয়ে সহনশীলতা প্রদর্শন করা কোনোভাবেই আত্মসমর্পণ নয়, বরং এটি জাতীয় ঐক্য ও উদার গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনের এক বলিষ্ঠ প্রতিফলন।

আরও পড়ুনঃ

চলতি মাস থেকে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ শুরু করবে সরকার: তথ্যমন্ত্রী

পরিশেষে, প্রতিশোধের নেশায় না মেতে নীতি-ভিত্তিক লড়াই এবং প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করাই হোক আগামী দিনের বাংলাদেশের রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি। অতীতের সেই কালো অধ্যায় থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করাই এখন সময়ের দাবি। যেখানে ক্ষমতা দখল হবে না, বরং ক্ষমতা অর্জিত হবে জনগণের সম্মতির ভিত্তিতে।

লেখক পরিচিতি: সিনিয়র সাংবাদিক ও সভাপতি, বাংলাদেশ অনলাইন জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন।

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Tarek Hasan is a professional journalist and currently works as a sub-editor at Zoom Bangla News. With six years of experience in journalism, he is an experienced writer with a strong focus on accuracy, clarity, and editorial quality. His work contributes to delivering reliable and engaging news content to digital audiences.