আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান : বিশ্ব অর্থনীতিতে অনেক কিছুই ঘটছে, যা প্রত্যাশিত নয়। আর আর্থিক খাতের অনেক কিছুর শুরুটা হয় পশ্চিমা বিশ্ব থেকে। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিষয়গুলো শুরু হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ। তাদের ফিন্যান্সিয়াল সিস্টেম অনেক ডেভেলপড। তারা ফিন্যান্সিয়াল সিস্টেমে আধুনিকতার প্রবর্তন করেছে। কিন্তু তার পরও তাদের দেশে একের পর এক ব্যাংক কলাপস (দেউলিয়া হয়) করে। ব্রিটেনে ব্র্যাঞ্চ ব্যাংকিং ব্যবস্থা অনুসরণ করা হয়। বাংলাদেশও ব্রিটিশের উত্তরাধিকারী হিসেবে ব্র্যাঞ্চ ব্যাংকিং পদ্ধতি অনুসরণ করে চলেছে। ব্র্যাঞ্চ ব্যাংকিং হচ্ছে সেই ব্যাংকিং ব্যবস্থা, যেখানে ব্যাংকের সংখ্যা থাকে তুলনামূলক কম। তারা বিপুলসংখ্যক শাখা স্থাপনপূর্বক ব্যাবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করে। ব্র্যাঞ্চ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় কোনো ব্যাংকের কিছুসংখ্যক শাখা বন্ধ হয়ে গেলে বা লোকসান দিলেও কোনো সমস্যা হয় না। কিন্তু ইউনিট ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ব্যাংকের শাখা সংখ্যা থাকে খুবই কম। কিন্তু ব্যাংকের সংখ্যা থাকে বেশি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইউনিট ব্যাংকিং ব্যবস্থা অনুসরণ করে থাকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দেখা যায়, একটি ব্যাংকের খুব কমসংখ্যক শাখা থাকে। হয়তো একটি শাখা নিয়েই একটি ব্যাংক পরিচালিত হয়। ফলে সেখানে কোনো একটি ব্যাংকের দু-একটি শাখা বন্ধ বা লোকসান দিলেই পুরো ব্যাংকের ওপর তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার ব্যাংক কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

Advertisement

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ট্র্যাডিশনাল ব্যাংক ছাড়াও অনেক আর্থিক প্রতিষ্ঠান আছে। যেমন, সেভিংস অ্যান্ড লোন, মিউচুয়াল ফান্ড, প্রভিডেন্ড ফান্ড, ক্রেডিট ইউনিয়নসহ বিভিন্ন ধরনের আর্থিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এরা অনেকটাই ব্যাংকের মতোই কাজ করে। এছাড়া ক্যাপিটাল মার্কেট, মানি মার্কেটও বেশ শক্তিশালী। ফরেন এক্সচেঞ্চ মার্কেট, বন্ড মার্কেট, ফিউচার কন্ট্রাক্ট মার্কেট, ক্রিপ্টো কারেন্সি মার্কেট কাজ করছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মার্কেট ইন্টারমিডিয়ারি অনেক বেশি। সেখানে রেগুলেটরের সংখ্যাও অনেক। প্রত্যেকটি সেক্টরের জন্য আলাদা আলাদা রেগুলেটর রয়েছে। আইন অমান্য করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মাঝেমধ্যেই ব্যাংকগুলোকে বিশাল অঙ্কের জরিমানা করা হয়। আমাদের দেশে যদি কোনো ব্যাংকের ওপর এ ধরনের জরিমানা করা হয়, তাহলে ব্যাংকটি বসে যাবে। সেখানে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বেশ শক্তিশালী। কিন্তু তার পরও একটার পর একটা অঘটন ঘটছে। ২০০৮ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যখন অর্থনৈতিক মন্দা, যেটা হলো সেখানে এক ধরনের কারণ কাজ করেছে।
২০০৬-২০০৭ সালে যখন মার্কিন অর্থনীতি ভালোভাবে কাজ করছিল তখন ব্যাংকগুলো আমানতকারীর অর্থে বেশি কিছু ঝুঁকিপূর্ণ বন্ড ক্রয় করে। এ বন্ডগুলোকে টক্সিক সিকিউরিটিজ বা অ্যাসেট হিসেবে গণ্য করা হয়। এগুলোর মাধ্যমে যারা ঋণ নিত তাদের নিয়মিত কোনো আয়-কর্ম ছিল না। এমনকি তাদের ইউটিলিটি বিলও নিয়মিত পরিশোধ করার সক্ষমতা ছিল না। এগুলোর মাধ্যমে ব্যাংক প্রচুর আয় করছিল। ২০০৮ সালে এগুলোর দরপতন হলে আমেরিকার শতাধিক ব্যাংক বন্ধ হয়ে যায়। সেই ঘটনার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অনেক ধরনের পলিসি মেজার গ্রহণ করে, যাতে ব্যাংকিং সেক্টরে আর কোনো বিপর্যয় না ঘটে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল স্ট্রেস টেস্ট, অর্থনৈতিক মডেলিংসহ আরো নতুন নতুন নীতি ও বিধিমালা। সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকিং সেক্টরে যে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে তা সম্পূর্ণ নতুন একটি বিষয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকিং ও ফিন্যান্সিয়াল সিস্টেমে যেসব আইনি সংস্কার করা হয়েছে, তাতে তারা কল্পনাও করতে পারেনি যে, ব্যাংকিং সেক্টরে এমন একটি বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।

অনেকটা হঠাত্ করেই সিলিকন ভ্যালি ব্যাংক (এসভিসি), সিগনেচার ব্যাংক বন্ধ হয়ে গেল। বলা হয় ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে। মার্কিন ব্যাংকিং সেক্টরে বর্তমানে যে দুরবস্থা চলছে তাতেও আমরা সেই পুনরাবৃত্তির বিষয়টি কিছুটা হলেও লক্ষ করি। ২০০৮ সালে বন্ডগুলো ছিল খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এবার ঠিক তার উলটো ঘটনা ঘটেছে। সরকারি ট্রেজারি বন্ড হচ্ছে সবচেয়ে নিরাপদ বন্ড। সাধারণ মানুষ ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারি ট্রেজারি বন্ডে নির্দ্বিধায় বিনিয়োগ করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি জনপ্রিয় ব্যাংক ছিল সিলিকন ভ্যালি ব্যাংক। তারা মূলত টেকনোলজি নিয়ে কাজ করে, এমন উদ্যোক্তাদের মূলত অর্থায়ন করত। যে কারণে ব্যাংকটি রাতারাতি জনপ্রিয়তা অর্জন করে। সিলিকন ভ্যালি ব্যাংক স্টার্ট আপ লোন কিংবা ভেঞ্চার ক্যাপিটাল সরবরাহে অর্থায়ন করত। ব্যাংকটির মোট যে আমানত ছিল তার অর্ধেকেরও কম ঋণ তারা এ খাতে দিয়েছে। এদিক থেকে তারা বেশ নিরাপদ অবস্থানেই ছিল। তারা একটি সেক্টরে অনেক বেশি ঋণ দিয়ে ফেলেছে, এমনটা নয়। আমাদের দেশেও এডিআর (অ্যাডভান্স ডিপোজিট রেশিও) ৮৫ শতাংশের মতো। অর্থাৎ ব্যাংকগুলোর যে আমানত সাধারণভাবে তার ৮৫ শতাংশ তারা ঋণ দিতে পারে। সেই ক্ষেত্রে সিলিকন ভ্যালি ব্যাংকের এডিআর রেশিও ছিল ৪০ শতাংশের কিছু বেশি। করোনার সময় ট্রেজারি বন্ডগুলোর রিটার্ন বা আয় কমে যায়। তখন পয়েন্ট জিরো ৮ পার্সেন্ট রিটার্নেও তারা কিছু বন্ড ক্রয় করেছে। ৫ থেকে ১০ বছর মেয়াদি যেসব বন্ড ক্রয় করা ছিল, তাতে মেয়াদপূর্তির পর এক থেকে দেড় শতাংশ রিটার্ন পাওয়ার কথা ছিল। এর মাঝখানে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে মূল্যস্ফীতি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যেতে শুরু করে। অস্বাভাবিক উচ্চ মাত্রার মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব আমেরিকা পলিসি রেট বাড়িয়ে দেয়। বন্ডগুলো ক্রয় করা হয় তখন ডিসকাউন্টে কেনা হয়, অর্থাৎ মেয়াদপূর্তিতে পূর্ণ মূল্য পাওয়া যায়। কিন্তু পলিসি রেট বেড়ে যাওয়ার কারণে বন্ডের প্রকৃত মূল্য কমে যায়। আগে যে বন্ডের মূল্য ছিল ৯৮ ডলার মূল্যস্ফীতি এবং পলিসি রেট বাড়ানোর ফলে সেই বন্ডে রিয়েল ভ্যালু হয়তো ৯৫ মার্কিন ডলারে নেমে এসেছে। সিলিকন ভ্যালি ব্যাংকের মোট বিনিয়োগের ৫০ শতাংশেরও বেশি ছিল বন্ডের ওপর। কিন্তু সেই বন্ডের প্রকৃত মূল্য কমে যাওয়ার কারণে তারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রতি ১০০ ডলারের বন্ডে তাদের প্রায় তিন ডলার করে ক্ষতি হয়। সিলিকন ভ্যালি ব্যাংকের মূলধন ছিল ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। সুদের হার বেড়ে যাওয়ার কারণে তাদের বন্ডের মূল্যে লোকসান হয়। তাদের মূলধন থেকে ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার লাপাত্তা হয়ে যায়। প্রত্যেক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের হিসাব বিবরণী নিয়মিত জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হয়। ব্যাংকটির এই অবস্থায় তাদের নতুন করে মূলধন প্রয়োজন। তারা নতুন করে বাজারে শেয়ার ছাড়ার উদ্যোগ গ্রহণ করে। ব্যাংকটির আর্থিক দীনতা যখন বাইরে জানাজানি হয়ে গেল তখন আমানতকারীদের মধ্যে একধরনের আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। আমানতকারীরা আতঙ্কিত হয়ে একযোগে সব আমানত উত্তোলন করতে শুরু করে। কোনো সময় আমানতকারীরা যদি একযোগে আমানত উত্তোলন করে, তাহলে সেই ব্যাংকের দেউলিয়া হওয়া ছাড়া কোনো গত্যন্তর থাকে না।

ইউরোপের কিছু কিছু ব্যাংকও দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছে বা যাওয়ার পর্যায়ে রয়েছে। ফিন্যান্সিয়াল সেক্টর পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। কাজেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকিং সেক্টরে যখন সমস্যা দেখা দেয় তার জের অনিবার্যভাবে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রভাব বিস্তার করে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের নীতি সুদহার বৃদ্ধি পেলে সেখানে অন্য দেশের বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো অধিক লাভের আশায় বিনিয়োগ করে। ইউরোপীয় বিনিয়োগকারীদের অনেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন বন্ডে বিনিয়োগ করেছে। ইউরোপীয় দেশগুলো যেসব ব্যাংক বন্ড বিক্রি করেছিল, সুদের হার বেড়ে যাওয়ার কারণে তাদেরও বন্ড ভ্যালুতে লোকসান হয়।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় কোনো ব্যাংক দেউলিয়া হওয়ার আশঙ্কা খুবই কম। বাংলাদেশের ব্যাংক দেউলিয়া না হওয়ার অনেকগুলো কারণ আছে। আমাদের দেশের আমানতকারীরা এখনো ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর আস্থাশীল। দেশে ব্যাংকিং সিস্টেম ছাড়া বিনিয়োগের তেমন কোনো বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। শেয়ারবাজার এখনো তেমন একটা বিকশিত হয়নি। আমানত সংরক্ষণ বলি, বিনিয়োগের জন্য অর্থায়ন সংগ্রহ করা প্রত্যেক কাজের জন্যই এখনো আমাদের ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকিং সেবা সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করছে। এখন উপজেলা শহর এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে গ্রামীণ এলাকাতেও ব্যাংকের শাখা স্থাপিত হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালাই হচ্ছে ব্যাংকিং কার্যক্রমকে গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে দেওয়া। উদ্বৃত্ত অর্থের মালিকরা জানেন টাকা ঘরে রাখলে তার কোনো নিরাপত্তা নেই। যে কোনো সময় অঘটন ঘটে যেতে পারে। এছাড়া টাকা ব্যাংকে আমানত হিসেবে সংরক্ষণ করা হলে কিছুটা মুনাফা পাওয়া যায়। ব্যাংক টাকা আমানত রাখার মাধ্যমে টাকার মালিক তার টাকার নিরাপত্তা বিধান করতে পারছে এবং একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারছে। ব্যাংকিং সেক্টরে কিছুু কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলেও নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাসহ অন্যান্য দায়িত্বপ্রাপ্ত সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সেগুলোর ব্যাপারে আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক চেষ্টা করছে কীভাবে ব্যাংকিং সেক্টরের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা বজায় রাখা যায়।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত ডেপুটি গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক
অনুলিখন : এম এ খালেক

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Saiful Islam is a journalist at Zoom Bangla News with seven years of experience in news writing and editorial work. He contributes to producing accurate, well-structured, and reader-focused content across digital platforms. His work reflects a strong commitment to editorial standards and responsible journalism.