মো: শাহীনূর আলম: রাজনীতি কোনো মসৃণ রাজপথ নয়, বরং এটি এক অত্যন্ত বন্ধুর, কণ্টকাকীর্ণ ও পিচ্ছিল পথ। এই দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় সুসময় এবং দুঃসময়—দুটি পর্বই মানুষের জীবনে এবং সংগঠনের ইতিহাসে পালাক্রমে আসে। কিন্তু একজন খাঁটি, আদর্শবান, আপসহীন ও পরীক্ষিত রাজনীতিকের প্রকৃত চেনা রূপটি ফুটে ওঠে মূলত চরম দুঃসময়ে, ঝড়ের রাতে, যখন চারদিকের পরিস্থিতি থাকে প্রতিকূল। বিগত ফ্যাসিস্ট ও স্বৈরাচারী শাসনামলের দীর্ঘ দেড় দশকের কালরাত্রিতে যারা নিজের ঘর ছেড়ে ফেরারি হয়েছেন, যাদের ব্যবসা-বাণিজ্য পুড়িয়ে ছারখার করা হয়েছে, যাদের পরিবারের ওপর অমানবিক ও নির্মম নির্যাতন চালানো হয়েছে এবং যারা প্রতিনিয়ত আদালতের বারান্দায় মিথ্যা ও গায়েবি মামলার হাজিরা দিতে দিন কাটিয়েছেন—তারাই হলেন এই দলের আসল প্রাণ, প্রকৃত পরীক্ষিত সৈনিক। আজ দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী লড়াই-সংগ্রাম ও অসংখ্য প্রাণের বিনিময়ে যখন সুদিনের আলো ফুটতে শুরু করেছে, যখন এই দীর্ঘ প্রতীক্ষিত বিজয়ের সুফল দেশের সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার কথা, ঠিক তখনই আমার চেনা মাঠের কিছু দৃশ্যপট ও অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা দেখে মনটা ভীষণ ভারাক্রান্ত হয়ে উঠছে। আজ খিলক্ষেতের আনাচে-কানাচে, রাজপথের আড্ডা থেকে শুরু করে কর্মীদের ঘরোয়া বৈঠক—সবখানেই একটি প্রশ্ন অত্যন্ত ভারী ও বেদনাদায়ক হয়ে ঘুরেফিরে বেড়াচ্ছে: আমার খিলক্ষেত থানা বিএনপির সিংহভাগ নেতাকর্মী ও সমর্থক কেন আজ এত হতাশ? আমি আমার খিলক্ষেত থানা বিএনপির কলিজার টুকরো ভাইদের, আমার জানের টুকরো সহযোদ্ধাদের বলতে চাই—আপনাদের এই মনের ভেতরের নীরব কান্না, এই গভীর হতাশা, অবমূল্যায়ন এবং তীব্র ক্ষোভ আমি চিকিৎসকের কড়া তদারকিতে হাসপাতালের বিছানায় শুয়েও প্রতি মুহূর্তে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারছি। আর সেই গভীর সাংগঠনিক, নৈতিক ও আত্মিক দায়বদ্ধতা থেকেই আজ আমি এই কলামের মাধ্যমে আপনাদের সামনে হাজির হতে বাধ্য হয়েছি। আমি আপনাদের মনের কষ্ট খুব ভালো করে বুঝি, কিন্তু এই কষ্ট ও ক্ষোভকে হতাশায় রূপ দিয়ে ঘরে বসে থাকা কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কেবল রাগ উগরে দেওয়া কোনো স্থায়ী সমাধান হতে পারে না।

আমি বেশ কিছুদিন ধরে অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছি, আমার খিলক্ষেত থানার অনেক পরীক্ষিত ও ত্যাগী কর্মী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে নানা বিষয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছেন, নিজেদের হতাশার কথা লিখছেন, দলের অভ্যন্তরীণ নানা গোপনীয় বিষয়ে কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি করে দলের মর্যাদা নষ্ট করছেন। আপনাদের এই আবেগের জায়গাকে সম্পূর্ণ সম্মান জানিয়েও আমি একজন বড় ভাই হিসেবে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় একটি কথা বলতে চাই—সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে সরব হয়ে গরম হওয়ার দরকার নেই। বর্তমান যুগে আমাদের দেশের সামগ্রিক রাজনীতিতে একটি বড় ও মারাত্মক মনস্তাত্ত্বিক ব্যাধি হয়ে দাঁড়িয়েছে এই ‘ফেসবুক সর্বস্ব রাজনীতি’। মাঠের কর্মসূচিতে সক্রিয় ভূমিকা না রেখে, রাজপথের লড়াইয়ে সশরীরে উপস্থিত হয়ে ঘাম না ঝরিয়ে কেবল ভার্চুয়াল জগতে স্ট্যাটাস দিয়ে বড় বড় কথা বলা, উত্তেজনা ছড়ানো কিংবা ক্ষোভ প্রকাশ করা কোনো প্রকৃত আদর্শিক রাজনৈতিক কর্মীর লক্ষণ হতে পারে না। ফেসবুকে বড় বড় লাইক, কমেন্ট আর ক্ষোভের বন্যা বইয়ে দিয়ে কখনো মাঠের বাস্তব রাজনৈতিক সংকটের সমাধান করা সম্ভব নয়। রাজনীতি করতে হয় জনগণের মন জয় করে, রাজপথে মানুষের পাশে উপস্থিত থেকে। আপনাদের মনে যে হতাশা জমেছে, তার মূল উৎস ফেসবুক নয়। এর আসল কারণ হলো মাঠের ভেতরের কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত বিচ্যুতি, বিশৃঙ্খলা ও কিছু মানুষের নোংরা স্বার্থপরতা। আজ যখন আপনাদের মূল্যায়িত হওয়ার কথা ছিল, যখন আপনাদের দীর্ঘদিনের ত্যাগ ও শ্রমের সঠিক সাংগঠনিক সম্মান পাওয়ার কথা ছিল, তখন কিছু সুযোগসন্ধানী ও স্বার্থান্বেষী মহলের অপতৎপরতার কারণে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে, যা আপনাদের ব্যথিত করছে। এই চরম বৈপরীত্যই আপনাদের মতো খাঁটি কর্মীদের মনে তীব্র কষ্টের জন্ম দিয়েছে। কিন্তু মনে রাখবেন, মাঠের লড়াই সবসময় মাঠেই জিততে হয়, ভার্চুয়াল জগতের অবাস্তব ময়দানে নয়। তাই ফেসবুকের মোহ সম্পূর্ণ ত্যাগ করে আমাদের আবার মাঠের মূল রাজনীতিতে মনোযোগী হতে হবে।
একটি রাজনৈতিক দল যখন দীর্ঘ দেড় দশক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে রাজপথে রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম করে জনগণের মাঝে নিজের সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করে বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছায়, তখন কিছু ‘হাইব্রিড’, ‘বসন্তের কোকিল’ কিংবা সুযোগসন্ধানী সুবিধাবাদী লোক চারপাশ থেকে দলে ভিড়তে শুরু করে। এরা দলের দুঃসময়ে মাটির নিচে লুকিয়ে থাকে, স্বৈরাচারের দালালি করে, কিন্তু সুসময় আসতেই মৌমাছির মতো মধুর খোঁজে চারপাশ থেকে ছেঁকে ধরে। আজ খিলক্ষেত থানা এলাকাতেও ঠিক তেমনি কিছু পরগাছার অপতৎপরতা ও অনাকাঙ্ক্ষিত ক্ষমতার দাপট আমার নজরে এসেছে। আমি আপনাদের আশ্বস্ত করে অত্যন্ত শক্ত ভাষায় বলতে চাই—চাঁদাবাজি, ধান্দাবাজি করে যারা দলের ক্ষতি করছে তাদের শায়েস্তা করার জন্য আপনাদের মধ্য থেকেই কেউ না কেউ সাহসী নেতৃত্ব দিবে। সময় গড়াতে দিন। আমাদের মূল দল বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শ কিংবা আমাদের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রনায়ক দেশনায়ক তারেক রহমানের স্পষ্ট বার্তা—দলে কোনো অপরাধী, চাঁদাবাজ, টেন্ডারবাজ বা ধান্দাবাজির ঠাঁই হবে না। যারা জনগণের ওপর জুলুম করে, সাধারণ ব্যবসায়ী বা নিরীহ মানুষের ওপর চাঁদাবাজি করে দলের দীর্ঘদিনের অর্জিত ভাবমূর্তি ধূলিসাৎ করছে, তারা আর যাই হোক, এই দলের কোনো বন্ধু হতে পারে না; তারা হলো ছদ্মবেশী পরম শত্রু। এই সব অপকর্মকারী ও সুবিধাবাদীদের দমনের জন্য আকাশ থেকে কোনো দেবদূত বা জাদুকর এসে আপনাদের রক্ষা করবে না। খিলক্ষেত থানার মাটিতে যারা বছরের পর বছর মার খেয়েছেন, জেল খেটেছেন, পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন, সেই পরীক্ষিত, সৎ, নিষ্ঠাবান ও সাহসী কর্মীদের মধ্য থেকেই নতুন ও আপসহীন নেতৃত্ব গড়ে উঠতে হবে এবং অন্যায়ের প্রতিবাদে আপনাদেরই বুক টান করে দাঁড়াতে হবে। রাজনীতিতে সময়ের একটি নিজস্ব ও অমোঘ বিচার ব্যবস্থা থাকে। আজ যারা সাময়িক ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে অপকর্ম করছে, মানুষের ওপর জুলুম করছে, সময় গড়ানোর সাথে সাথে তারা ইতিহাসের আস্তাকুড়ে ও রাজনীতির ডাস্টবিনে নিক্ষিপ্ত হবে—এটাই চিরন্তন সত্য। তাই ত্যাগী ও খাঁটি কর্মীদের হতাশ হয়ে মাঠ ছেড়ে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার এবং এই ধান্দাবাজদের প্রতিহত করার এখনই উপযুক্ত সময়।
আজ খিলক্ষেতের যারা হতাশায় ভুগছেন, যারা ভাবছেন গুটিকয়েক অপশক্তির কাছে আপনারা বুঝি চিরতরে হেরে যাচ্ছেন, তাদের আমি আমার নিজের রাজনৈতিক জীবনের এক অত্যন্ত কঠিন ও গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের কথা আবার স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, যা আপনাদের ভেতরের শক্তিকে জাগিয়ে তুলবে। আমি আপনাদের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন রাখতে চাই—আমি বৃহত্তর ক্যান্টনমেন্ট থানার পতিত সরকারের দুর্গ ভেঙে বিএনপিকে যদি শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড়া করাতে পারি, তাহলে আপনারা কেন পারবেন না? আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে, ঢাকা মহানগর উত্তরের অধীনে বৃহত্তর ক্যান্টনমেন্ট এলাকাটি রাজনৈতিকভাবে কতটা সংবেদনশীল, জটিল, কড়া নজরদারি পরিবেষ্টিত ও কঠিন একটি অঞ্চল ছিল। বিশেষ করে বিগত ফ্যাসিস্ট ও পতিত স্বৈরাচারী সরকারের আমলে সেখানে বিরোধী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা, দলের ব্যানার নিয়ে রাস্তায় দাঁড়ানো ছিল নিজের জীবনকে নিশ্চিত অগ্নিকুণ্ডে সঁপে দেওয়ার সামিল। চারদিকে ছিল গোয়েন্দা রাজত্ব আর রাষ্ট্রীয় ও দলীয় পেটুয়া বাহিনীর নগ্ন তাণ্ডব। সেই চরম বৈরী, শ্বাসরুদ্ধকর ও প্রতিকূল পরিবেশেও শাহীনূর আলম এক পা-ও পিছিয়ে যায়নি, কারো কাছে মাথা নত করেনি এবং দমে যায়নি। আপনাদের ভালোবাসা, অকুণ্ঠ সমর্থন, সাহসিকতা, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও সঠিক সাংগঠনিক দূরদর্শিতা নিয়ে আমি স্বৈরাচারী সরকারের সেই অভেদ্য ‘দুর্গ’ ভেঙে চুরমার করেছিলাম। সমস্ত ভয়-ভীতি ও মৃত্যুকে উপেক্ষা করে ক্যান্টনমেন্টের বুকে বিএনপিকে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী, তৃণমূল স্তরে সুসংগঠিত ও ইস্পাতকঠিন ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছিলাম। যেখানে রাষ্ট্রযন্ত্রের এত বড় ক্ষমতার শক্ত দুর্গ আমরা ভাঙতে পেরেছি, সেখানে আজ খিলক্ষেত থানা বিএনপির সামান্য কিছু অভ্যন্তরীণ জটিলতা, সাময়িক কিছু বিশৃঙ্খলা বা গুটিকয়েক উচ্ছিষ্টভোগী ধান্দাবাজকে আমরা প্রতিহত করতে পারব না—তা হতেই পারে না। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, যদি ক্যান্টনমেন্টের মতো কঠিন জায়গায় আমরা শতভাগ সফল হতে পারি, তবে খিলক্ষেতের এই পবিত্র মাটিতেও আমরা অবশ্যই সফল হব। এর জন্য প্রয়োজন শুধু আপনাদের ভেতরের ঘুমন্ত সিংহকে জাগিয়ে তোলা, নিজেদের ওপর বিশ্বাস রাখা আর ইস্পাতকঠিন মনোবল বজায় রাখা।
রাজনীতি ও ক্ষমতার মাঠে সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি ও পরিহাস হলো—ঝড়-তুফান, কালবৈশাখী আর রাজপথের লড়াকু আন্দোলনের দিনে যাদের দূরবীন দিয়েও খুঁজে পাওয়া যায় না, সুসময় আসতেই তারা কোত্থেকে যেন সুন্দর পোশাক পরে উড়ে এসে জুড়ে বসে এবং মঞ্চের প্রথম সারিতে বসার জন্য কনুইয়ের ধাক্কাধাক্কি শুরু করে। বিগত দেড় দশক ধরে যারা দলের কোনো কর্মসূচিতে ছিলেন না, যারা নিজেদের ব্যবসা সচল রাখতে ও আখের গোছাতে ব্যস্ত ছিলেন কিংবা ফ্যাসিবাদের তল্পিবাহকদের সাথে গোপন আঁতাত করে নিজেদের চামড়া বাঁচিয়েছেন, আজ সুসময় আসতেই তারা হঠাৎ করে বড় বড় নেতা সেজে কর্মীদের ওপর হুকুম চালাচ্ছেন। আমি অত্যন্ত ক্ষোভ, দুঃখ ও গভীর আক্ষেপের সাথে আপনাদের বলছি—আমার হাতে গড়া সংগঠন সুদিনে আগত বিএনপির তথাকথিত মাত্র কয়েকজন নেতা ধ্বংস করে দিবে এটা হতে পারে না। খিলক্ষেত থানা বিএনপি কোনো ভুঁইফোড় বা হঠাৎ গজিয়ে ওঠা কোনো পকেট সংগঠন নয়। এটি আমার মতো এবং আপনাদের মতো অসংখ্য ত্যাগী নেতাকর্মীর রক্ত, ঘাম, অশ্রু আর জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় বিসর্জনের বিনিময়ে গড়ে ওঠা একটি অত্যন্ত পবিত্র ও সুসংগঠিত পরিবার। গুটিকয়েক ‘সুদিনে আগত তথাকথিত’ নেতা এসে তাদের নিজেদের ব্যক্তিগত আখের গোছাতে কিংবা পকেট রাজনীতি কায়েম করতে এই ঐতিহ্যের সংগঠনকে ধ্বংস করে দেবে—তা আমি শাহীনূর আলম বেঁচে থাকতে কোনোদিনও হতে দেব না। আমার তৃণমূলের ভাইদের মনে রাখতে হবে, দল আজ সুদিনের মুখ দেখছে আপনাদের মতো সাধারণ কর্মীদের দীর্ঘ আত্মত্যাগ আর বুক চিলতে বের হওয়া রাজপথের স্লোগানের বিনিময়ে, ওই তথাকথিত ড্রয়িংরুমের নেতাদের জন্য নয়। তাই সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ ও চাবিকাঠি যেন কোনোভাবেই ওই উচ্ছিষ্টভোগী ও বসন্তের কোকিলদের হাতে চলে না যায়, সে ব্যাপারে আপনাদের সর্বোচ্চ সতর্ক, সচেতন ও সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।
আপনাদের অনেকের মনেই হয়তো প্রশ্ন জাগছে, খিলক্ষেত বিএনপির এই ক্রান্তিলগ্নে, এই তীব্র সাংগঠনিক সংকটের সময় আমি কোথায়? কেন আমি আপনাদের সামনে সশরীরে উপস্থিত হতে পারছি না? আমি আপনাদের অত্যন্ত বিনয়ের সাথে জানাতে চাই, আমি বর্তমানে বেশ কজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কঠোর তদারকিতে নিয়মিত চিকিৎসা সেবা নিচ্ছি। শারীরিকভাবে আমি কিছুটা অসুস্থ এবং হাসপাতালের বেডে শয্যাশায়ী থাকলেও, আমার মন, আমার প্রাণ, আমার প্রতি মুহূর্তের চিন্তা ও চেতনা পড়ে আছে খিলক্ষেতের ধূলিকণায়, খিলক্ষেতের মাটিতে এবং আমার কলিজার টুকরো কর্মীদের মাঝে। আমি আশা করি এবং মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি, খুব অল্প সময়ে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাকে পূর্ণ সুস্থতা দান করবেন এবং আমি আবার দ্বিগুণ শক্তি নিয়ে আপনাদের মাঝে সশরীরে ফিরে আসব। অনেকে হয়তো ভাবছেন, বর্তমানের এই জটিল পরিস্থিতি যদি আপনারা একা একা মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হন, তবে খিলক্ষেত বিএনপির ভবিষ্যৎ কী হবে? আপনাদের কি তবে কেউ দেখার নেই? আমি আপনাদের একজন ভাই হিসেবে, একজন আজীবনের সহযোদ্ধা ও অভিভাবক হিসেবে অভয় দিয়ে বলতে চাই—আপনাদের কোনো ভয় নেই, আমি আপনাদের ব্যর্থ হতে দেবো না। আমি সুস্থ হয়ে ওঠার সাথে সাথেই আবার খিলক্ষেতের রাজনীতির সরাসরি হাল ধরব।
আপনাদের অভিভাবক এখনো মরে যায়নি, এখনো সজাগ ও জীবিত আছে। হাসপাতালের বিছানায় শুয়েও আমি খিলক্ষেতের প্রতি মুহূর্তের ভালো-মন্দের খবর রাখছি এবং কার কী ভূমিকা তা পর্যবেক্ষণ করছি। তাই নিজেকে কখনো একা, অসহায় বা অভিভাবকহীন ভাবার কোনো কারণ নেই। মনের সব জঞ্জাল, দ্বিধা আর হতাশা ঝেড়ে ফেলে বুক টান করে অন্যায়ের সামনে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ান।
রাজনীতি কোনো ১০০ মিটারের দ্রুতগতির স্প্রিন্ট রেস নয়, এটি একটি দীর্ঘ ও ধৈর্যশীল ম্যারাথন লড়াই। এখানে জোয়ার-ভাটা থাকবে, উত্থান-পতন থাকবে এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দলও আসবে। কিন্তু যারা শেষ পর্যন্ত ধৈর্য ধরে সঠিক আদর্শের ওপর টিকে থাকে, চূড়ান্ত বিজয় তাদেরই সুনিশ্চিত হয়। তাই খিলক্ষেত থানা বিএনপির পরীক্ষিত সৈনিকদের কোনোভাবেই হতাশ হয়ে পড়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। এই কলামের মাধ্যমে আমি আমার খিলক্ষেত থানার সর্বস্তরের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট সাংগঠনিক নির্দেশনা ও বার্তা দিয়ে যেতে চাই।
প্রথমত, ভার্চুয়াল মোহ সম্পূর্ণ ত্যাগ করে ফেসবুকের কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি আজ থেকেই বন্ধ করতে হবে এবং মাঠের মূলধারার রাজনীতিতে সক্রিয় হতে হবে। জনগণের সুখ-দুঃখে সরাসরি তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে বিএনপিই তাদের প্রকৃত বন্ধু।
দ্বিতীয়ত, যারা সুদিনে এসে চাঁদাবাজি, ধান্দাবাজি ও দলবাজি করে দলের ত্যাগী কর্মীদের কোণঠাসা করতে চায়, সেই সব অনুপ্রবেশকারীদের সম্পূর্ণ চিহ্নিত করে সামাজিকভাবে ও সাংগঠনিকভাবে বয়কট করতে হবে। দলের ভেতরে এদের কোনো প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না।
তৃতীয়ত, আমার অনুপস্থিতিতে কেউ যেন আবেগের বশে কোনো উস্কানিতে পা না দেন; সবাইকে সর্বোচ্চ ধৈর্য, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও সহনশীলতা প্রদর্শন করে সঠিক সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
আরও পড়ুনঃ কক্সবাজারে সন্ধ্যার পর বখাটে ও মাদকসেবীদের উৎপাত, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন পর্যটকরা
পরিশেষে আমি বলব, মানুষের শক্তি সীমিত, তাই একমাত্র সর্বশক্তিমান মহান আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখুন। ভালো রাখুক আল্লাহ আপনাদের সবাইকে। আমাদের নিজেদের ভেতরের এই শুদ্ধি অভিযান এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মাধ্যমে খিলক্ষেত থানা বিএনপি আবার তার পুরোনো গৌরব, ঐতিহ্য ও রাজপথের তেজ ফিরে পাবে—এটাই আমার দৃঢ় বিশ্বাস। তবে তার জন্য প্রথম এবং প্রধান শর্ত হলো আমাদের ভেতরের ইস্পাতকঠিন একতা ও পারস্পরিক ভালোবাসা। আমার অনুপস্থিতিতে কোনো কুচক্রী বা স্বার্থান্বেষী মহল যেন আমাদের এই দীর্ঘদিনের ভ্রাতৃত্বের মাঝে কোনো বিভেদ, ফাটল বা ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি করতে না পারে। সর্বস্তরের কর্মীকে একসাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে হবে। সকল ষড়যন্ত্র ও সুবিধাবাদীদের রুখে দিয়ে আপনাদের একটাই স্লোগান হোক আগামী দিনের পথচলার মূল পাথেয়—”ঐকবদ্ধ থাকুক খিলক্ষেত থানা বিএনপি।” খিলক্ষেতের মাটি ও মানুষের সাথে আমার রক্তের সম্পর্ক, এই সম্পর্ক ভাঙার শক্তি কারো নেই।
লেখক পরিচিত: প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি খিলক্ষেত থানা বিএনপি
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।



