প্রায় ১১ কোটি ৩০ লাখ বছর পুরোনো একটি ডাইনোসরের খুলি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কের অবসান ঘটতে যাচ্ছে। জার্মানির স্টুটগার্টের রাষ্ট্রীয় প্রাকৃতিক ইতিহাস জাদুঘর-এ সংরক্ষিত বিরল এই জীবাশ্মটি অবশেষে ব্রাজিলে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বৈশ্বিকভাবে সাংস্কৃতিক সম্পদ ফেরত দেওয়ার (রেস্টিটিউশন) ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ডাইনোসর

Advertisement

১৯৯১ সালে জাদুঘরটি একটি ডাইনোসরের জীবাশ্ম খুলি সংগ্রহ করে। পরবর্তী গবেষণায় জানা যায়, এটি স্পাইনোসরিড পরিবারের অন্তর্ভুক্ত একটি মাংসাশী ডাইনোসরের সবচেয়ে সম্পূর্ণ খুলিগুলোর একটি এবং সম্পূর্ণ নতুন একটি গণের প্রতিনিধি।

১৯৯৬ সালে জীবাশ্মটির নাম রাখা হয় ইরিটেটর চ্যালেঞ্জারি। ‘ইরিটেটর’ নামটি দেওয়া হয় কারণ খুলিটির সামনের অংশে পূর্বে ঘষামাজার চিহ্ন ছিল, যা গবেষকদের জন্য বিরক্তিকর হয়ে উঠেছিল। আর ‘চ্যালেঞ্জারি’ নামটি নেওয়া হয় আর্থার কোনান ডয়েল-এর সৃষ্ট কাল্পনিক চরিত্র প্রফেসর চ্যালেঞ্জারের নাম থেকে।

গবেষণা অগ্রসর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্রাজিলের বিজ্ঞানীরা আপত্তি জানান, কারণ জীবাশ্মটির উৎস যে ব্রাজিল—এমন ধারণা ক্রমশ জোরালো হতে থাকে।

ব্রাজিলের ১৯৪২ সালের আইন অনুযায়ী, দেশের ভেতরে আবিষ্কৃত সব জীবাশ্ম রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি। এছাড়া ১৯৯০ সাল থেকে জীবাশ্ম বিদেশে নিতে হলে সরকারি অনুমতি ও স্থানীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক। কিন্তু এই জীবাশ্মটি ঠিক কবে এবং কীভাবে ব্রাজিল থেকে বাইরে নেওয়া হয়েছিল, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে এর আইনগত অবস্থান দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্নবিদ্ধ ছিল।

সম্প্রতি জার্মানি ও ব্রাজিল যৌথভাবে জানিয়েছে, তারা জীবাশ্ম গবেষণায় পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদার করতে চায়। এই প্রেক্ষাপটে স্টুটগার্টের জাদুঘর জীবাশ্মটি ব্রাজিলকে হস্তান্তরে সম্মত হয়েছে।

জীবাশ্মটি ফেরত দেওয়ার দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন চলছিল। বিশ্বজুড়ে ২৬৩ জন বিশেষজ্ঞ একটি খোলা চিঠিতে স্বাক্ষর করেন এবং ৩৪ হাজারেরও বেশি মানুষ অনলাইন পিটিশনের মাধ্যমে এ দাবির প্রতি সমর্থন জানান।

ব্রাজিলের জীবাশ্মবিদ অধ্যাপক আলিনে গিলহার্দি বলেন, এই সিদ্ধান্ত রেস্টিটিউশনের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। জনসচেতনতা বৃদ্ধিই এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছে। তার মতে, এটি শুধু বৈজ্ঞানিক নয়, সাংস্কৃতিক ও প্রতীকী দিক থেকেও ব্রাজিলের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

কারিরি আঞ্চলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অ্যালিসন পন্টেস পিনেইরোও এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি মনে করেন, এটি আরও নৈতিক এবং উপনিবেশবাদমুক্ত বৈজ্ঞানিক চর্চার দিকে অগ্রসর হওয়ার ইঙ্গিত, যেখানে স্থানীয় আইন, সংস্কৃতি ও বাস্তবতাকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়।

তবে কিছু সমালোচক যৌথ ঘোষণায় ‘ফেরত’ বা ‘প্রত্যাবর্তন’ শব্দের পরিবর্তে ‘হস্তান্তর’ শব্দ ব্যবহারে আপত্তি তুলেছেন। তাদের মতে, এতে বিষয়টির গুরুত্ব কিছুটা খাটো হয়ে যায়।

আইন গবেষক পল স্টিউভেন্স বলেন, স্থানীয় বিজ্ঞানীদের অংশগ্রহণ ছাড়া বিদেশে জীবাশ্ম নিয়ে গবেষণা করা এক ধরনের নব-উপনিবেশবাদী চর্চা। এতে উৎস দেশ গবেষণার সুফল থেকে বঞ্চিত হয়।

তিনি আরও বলেন, জীবাশ্ম একটি দেশের ঐতিহ্যের অংশ, যা মানুষের পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।

এর আগে ২০২৩ সালে ‘উবিরাজারা’ নামে আরেকটি ব্রাজিলীয় জীবাশ্মও জার্মানি থেকে ফেরত দেওয়া হয়েছিল। গবেষক এমা ডান মনে করেন, এখনও অনেক জীবাশ্ম রয়েছে, যেগুলো নিজ দেশে ফিরিয়ে দেওয়া উচিত।

অন্যদিকে কিছু গবেষক ভিন্নমতও প্রকাশ করেছেন। পোর্টসমাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডেভিড মার্টিল বলেন, তিনি জীবাশ্ম ফেরত দেওয়ার ঘটনায় সন্তুষ্ট হলেও কেবল জার্মান জাদুঘরগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা যথার্থ নয়, কারণ অন্যান্য দেশেও ব্রাজিলের বহু জীবাশ্ম সংরক্ষিত রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, এই জীবাশ্ম সংরক্ষণ ও গবেষণার পেছনে দীর্ঘ সময় ও শ্রম ব্যয় হয়েছে এবং তিনি আশা করেন, ব্রাজিল এটিকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনা হয়তো সব জীবাশ্ম ফেরতের ধারা তৈরি করবে না, তবে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে—যেমন, ব্রাজিলীয় বিজ্ঞানীদের বিদেশে গিয়ে গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি করা।

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Mynul Islam Nadim is a journalist at Zoom Bangla News, contributing to news writing and editorial support. He is involved in refining content to ensure accuracy, clarity, and consistency for digital platforms. His work reflects a commitment to responsible journalism and audience-focused reporting.