পবিত্র কোরআনের সূরা আদিয়াতে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, “শপথ তাদের, যারা হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটে চলে এবং খুরের আঘাতে আগুনের স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে দেয়।” এখানে কার কথা বলা হয়েছে, তা স্পষ্ট করে উল্লেখ করা হয়নি। আরবের তৎকালীন পরিবেশ ও প্রেক্ষাপট বিবেচনায় অনেক তাফসিরকার বলেছেন, এখানে যুদ্ধক্ষেত্রে ছুটে চলা ঘোড়ার কথা বোঝানো হয়েছে। কেউ কেউ উটের কথা বলেছেন। আবার একদল মুফাসসিরের মতে, এখানে মানুষের কথাই ইঙ্গিত করা হয়েছে। কারণ পরবর্তী আয়াতগুলোতে মানুষের অকৃতজ্ঞতা ও ধন-সম্পদের প্রতি তার অন্ধ আসক্তির কথা তুলে ধরা হয়েছে।

আজকের পৃথিবীর দিকে তাকালে মনে হয়, মানুষ যেন সেই হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটে চলা ঘোড়ারই প্রতিচ্ছবি। যেমন যুদ্ধের ঘোড়া ছুটতে ছুটতে শত্রুশিবিরে প্রবেশ করে, তেমনি মানুষও পার্থিব লোভের পেছনে দৌড়াতে দৌড়াতে অজান্তেই শয়তানের প্রলোভনের জগতে প্রবেশ করে। তখন তার চিন্তা-চেতনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে শুধু সম্পদ অর্জন। কীভাবে আরও অর্থ উপার্জন করা যায়, আরও জমিজমা কেনা যায়, আরও ধন-সম্পদের মালিক হওয়া যায়—এই চিন্তাই তাকে গ্রাস করে রাখে।
এই মোহে ডুবে থাকা মানুষ বুঝতেই পারে না কখন তার শৈশব ফুরিয়ে গেছে, কখন যৌবন পেরিয়ে বার্ধক্য এসেছে, কিংবা কখন মৃত্যুর দুয়ারে এসে দাঁড়িয়েছে। কারণ যে মানুষ নিরন্তর ছুটে চলে, সে পথের দিকে তাকানোর অবকাশ পায় না। দুনিয়ার মোহে মগ্ন মানুষও তেমনি নিজের প্রকৃত গন্তব্য ভুলে যায়।
একদিন মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) সাহাবিদের সামনে দুনিয়ার ক্ষণস্থায়িত্ব ও প্রতারণার স্বরূপ বর্ণনা করছিলেন। তিনি বলছিলেন, কীভাবে এই পৃথিবী মানুষকে বিভ্রান্ত করে এবং সংসারের বন্ধনে আবদ্ধ করে রাখে। একপর্যায়ে তিনি সাহাবিদের বললেন, “তোমরা কি দুনিয়ার প্রকৃত অবস্থা নিজের চোখে দেখতে চাও?” সাহাবিরা সম্মতি জানালে তিনি তাঁদের সঙ্গে নিয়ে মদিনার বাজারের এক পাশে গেলেন, যেখানে আবর্জনার স্তূপ জমে ছিল।
সেখানে একটি মৃত ছাগল পড়ে ছিল। চারদিকে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছিল। সাহাবিরা নাক চেপে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁদের জিজ্ঞেস করলেন, “তোমরা নাক চেপে ধরেছ কেন?” তাঁরা বললেন, “ইয়া রাসুলাল্লাহ, এখানে প্রচণ্ড দুর্গন্ধ।” তিনি বললেন, “দুনিয়ার দুর্গন্ধ এর চেয়েও বেশি।”
এরপর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “যদি এই মৃত ছাগলটি তোমাদের দেওয়া হয়, তোমরা কি গ্রহণ করবে?” সাহাবিরা বললেন, “না, বিনা মূল্যে দিলেও গ্রহণ করব না।” তখন নবীজি (সা.) বললেন, “আল্লাহর কাছে এই দুনিয়ার মূল্য এর চেয়েও কম। জ্ঞানী ও আল্লাহভীরু মানুষ দুনিয়াকে জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য বানায় না।”
কিন্তু আফসোস, বহু মানুষ এই ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীর মোহে পড়ে নিজেদের চিরস্থায়ী জীবনের ক্ষতি করছে। তারা আখিরাতের বিনিময়ে দুনিয়া ক্রয় করছে, অথচ এই পৃথিবী ছিল আখিরাতের পাথেয় সংগ্রহের ক্ষেত্র।
কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় মানুষের এই আত্মবিস্মৃত অবস্থার এক চমৎকার চিত্র এঁকেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, মানুষ নিজের বুকপকেটের চিন্তায় এত ব্যস্ত যে নিজের হৃদয়ের অমূল্য সম্পদের খোঁজই পায় না। ধন-সম্পদের হিসাব করতে করতে একসময় তার জীবন নিঃশেষ হয়ে যায়, অথচ সে টেরও পায় না।
বাস্তবতাও তাই। আমরা অধিক অর্থ, বড় বাড়ি, দামী গাড়ি ও ভোগবিলাসের আশায় ছুটে চলেছি। কিন্তু নিজের আত্মাকে জানার চেষ্টা করছি না, স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভের সাধনা করছি না। এভাবে একদিন হঠাৎ মৃত্যু এসে দরজায় কড়া নাড়ে।
তাই হে মানুষ, দুনিয়ার পেছনে নয়, আল্লাহর সন্তুষ্টির পেছনে ছুটো। যদি আল্লাহকে পাওয়ার চেষ্টা করো, তবে দুনিয়াও তোমার জন্য কল্যাণকর হয়ে উঠবে। আর যদি দুনিয়াকেই একমাত্র লক্ষ্য বানাও, তবে একদিন সে-ই তোমাকে এমন ক্ষতির মুখে ঠেলে দেবে, যার কোনো প্রতিকার থাকবে না। কারণ দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আখিরাত চিরস্থায়ী।
লেখক : মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।



