সুন্দর উপদেশ মানুষের হৃদয়কে জাগিয়ে তোলে, গাফিলতি ও উদাসীনতা থেকে সতর্ক করে এবং অন্তরের নানা রোগ নিরাময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি সৎকাজের নির্দেশ ও অসৎকাজ থেকে বিরত রাখার মহান দায়িত্বেরই একটি অংশ। সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে মানুষকে আল্লাহর পথে আহ্বান করা হয়, কল্যাণের প্রতি উৎসাহিত করা হয় এবং অকল্যাণ সম্পর্কে সতর্ক করা হয়।

এর ফলে মানুষের হৃদয় কোমল হয়, মন নম্র হয় এবং সে মন্দ পরিণতি থেকে বাঁচতে ও কল্যাণ লাভ করতে সৎকর্মের পথে অগ্রসর হয়।
সুন্দর উপদেশ গ্রহণের দুটি প্রধান উপায় রয়েছে। প্রথমত, শোনা, পড়া ও তিলাওয়াতের মাধ্যমে। নবী-রাসুলদের বাণী, আল্লাহপ্রদত্ত ওহি এবং সৎ ও কল্যাণকামী মানুষের উপদেশ মানুষের জীবনকে আলোকিত করে। দ্বিতীয়ত, পৃথিবীর নানা ঘটনা, অভিজ্ঞতা, আল্লাহর নিদর্শন এবং তাঁর নির্ধারিত বিধানগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ ও চিন্তা করার মাধ্যমে শিক্ষা গ্রহণ করা।
মানুষের হৃদয়ের জন্য উপদেশের প্রয়োজন জ্ঞান অর্জনের প্রয়োজনের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। বরং উপদেশ হৃদয়কে এমনভাবে প্রস্তুত করে, যাতে সে সহজে উপকারী জ্ঞান গ্রহণ করতে পারে। হৃদয় কোমল হলে আত্মা প্রশান্তি পায়, মন শান্ত হয়, বিবেক শক্তিশালী হয় এবং মানুষ সত্যকে গ্রহণ করার সক্ষমতা অর্জন করে।
এ কারণেই আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনকে উপদেশ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। কোরআন মানুষের জন্য হেদায়েত, অন্তরের রোগের আরোগ্য এবং মুমিনদের জন্য রহমত। কোরআনের বাণী হৃদয়কে নরম করে, চিন্তাকে শুদ্ধ করে এবং মানুষকে সত্য ও ন্যায়ের পথে পরিচালিত করে।
আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসুল (সা.)-কে নির্দেশ দিয়েছেন প্রজ্ঞা ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে মানুষকে তাঁর পথে আহ্বান করতে। কারণ মানুষের স্বভাব ও মানসিকতা এক রকম নয়। কেউ সত্যের অনুসন্ধানী, তাকে যুক্তি ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে বোঝানো যথেষ্ট। কেউ উদাসীন ও গাফিল, তার জন্য প্রয়োজন হৃদয়স্পর্শী উপদেশ। আবার কেউ বিরোধিতাপ্রবণ হলে তার সঙ্গে উত্তম পদ্ধতিতে আলোচনা করতে হয়।
সুন্দর উপদেশের কার্যকারিতা অনেকাংশে নির্ভর করে সঠিক সময় ও উপযুক্ত পদ্ধতির ওপর। দীর্ঘ খরার পরে যেমন বৃষ্টি জমিনকে সজীব করে তোলে, তেমনি যথাসময়ে দেওয়া উপদেশ মানুষের হৃদয়কে জাগ্রত করে। তবে অতিরিক্ত বৃষ্টি যেমন ফসলের ক্ষতি করতে পারে, তেমনি অতিরিক্ত উপদেশও মানুষের মনে বিরক্তির জন্ম দিতে পারে।
একইভাবে উপদেশ অবশ্যই পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর উপদেশগুলো ছিল সংক্ষিপ্ত, হৃদয়গ্রাহী এবং বাস্তব জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। তাঁর উপদেশ শুনে সাহাবিদের হৃদয় কেঁপে উঠত এবং তাঁদের চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে যেত। এটাই প্রকৃত উপদেশের প্রভাব।
আজকের যুগে শিক্ষক, লেখক, দাঈ, প্রশিক্ষক এবং গণমাধ্যমকর্মীদের উচিত মানুষের কাছে সত্য ও কল্যাণের বার্তা পৌঁছে দেওয়া। কখনো কখনো একটি আন্তরিক বাক্য আল্লাহর ইচ্ছায় এমন একটি হৃদয়কে জাগিয়ে তুলতে পারে, যা দীর্ঘদিন ধরে গাফিলতির অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল।
বর্তমান সময়ে নানা ধরনের সংশয়, বিভ্রান্তি ও অবিশ্বাস ছড়িয়ে পড়ছে। এসব সমস্যার পেছনে অনেক ক্ষেত্রেই হৃদয়ের উদাসীনতা ও আত্মিক শূন্যতা কাজ করে। তাই কেবল তর্ক-বিতর্ক নয়, বরং হৃদয়কে জাগ্রত করার জন্য উপদেশ ও নসিহতের প্রয়োজন রয়েছে। হৃদয় প্রস্তুত হলে সত্য গ্রহণ করাও সহজ হয়ে যায়।
দুঃখজনক হলেও সত্য, যে সময়ে সুন্দর উপদেশের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি, সে সময়েই আন্তরিক উপদেশদাতার সংখ্যা কমে যাচ্ছে। কেউ কেউ উপদেশকে কেবল আবেগের বিষয় মনে করেন। অথচ জ্ঞানী ও চিন্তাশীল মানুষদেরও হৃদয়কে সজীব রাখতে উপদেশের প্রয়োজন হয়।
নিঃসন্দেহে কিছু ক্ষেত্রে উপদেশের নামে দুর্বল কাহিনি, ভিত্তিহীন ঘটনা কিংবা কুসংস্কার প্রচার করা হয়। কিন্তু এর জন্য উপদেশের গুরুত্ব কমে যায় না। বরং প্রয়োজন হলো উপদেশকে মিথ্যা ও অতিরঞ্জন থেকে মুক্ত রেখে সত্য, জ্ঞান ও কল্যাণের ভিত্তিতে উপস্থাপন করা।
সুতরাং বর্তমান যুগে সুন্দর উপদেশের প্রয়োজন অপরিসীম। এমন একটি আন্তরিক ও সত্য বাক্য, যা কোনো মানুষকে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে আনে, তা দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জীবনের জন্য বিরাট কল্যাণের কারণ হতে পারে। তাই প্রত্যেক জ্ঞানী, শিক্ষক, দাঈ ও কল্যাণকামী মানুষের কর্তব্য হলো প্রজ্ঞা, আন্তরিকতা ও উত্তম আচরণের মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে উপকারী উপদেশ পৌঁছে দেওয়া।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।



