মানুষের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ কী? ধন-সম্পদ, ক্ষমতা, সৌন্দর্য কিংবা খ্যাতি—এসবের কোনোটিই নয়। মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো সময়। কারণ হারিয়ে যাওয়া অর্থ-সম্পদ কিংবা সুযোগ অনেক সময় ফিরে পাওয়া সম্ভব হলেও একবার চলে যাওয়া একটি মুহূর্ত কখনোই ফিরে আসে না।

দিন ও রাতের নিরবচ্ছিন্ন আবর্তন, মাস ও বছরের পালাবদল, শৈশব থেকে যৌবন এবং যৌবন থেকে বার্ধক্যের দিকে মানুষের অগ্রযাত্রা আমাদের প্রতিনিয়ত স্মরণ করিয়ে দেয়—এই পৃথিবীতে আমাদের অবস্থান ক্ষণস্থায়ী। আমরা সবাই একটি নির্ধারিত গন্তব্যের দিকে দ্রুত এগিয়ে চলেছি।
প্রতিটি সূর্যোদয় যেন জীবনের নতুন একটি অধ্যায়ের সূচনা করে, আর প্রতিটি সূর্যাস্ত সেই দিনের হিসাবের খাতা বন্ধ করে দেয়। তাই একজন সচেতন মুমিনের কাছে সময়ের প্রবাহ শুধু ক্যালেন্ডারের পরিবর্তন নয়; বরং আত্মসমালোচনা, আত্মশুদ্ধি এবং মহান আল্লাহর দিকে ফিরে আসার এক গুরুত্বপূর্ণ আহ্বান।
আল্লাহ তাআলা বলেন, “হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং প্রত্যেক ব্যক্তি যেন লক্ষ্য করে, আগামীকালের জন্য সে কী প্রেরণ করেছে।” (সুরা হাশর : ১৮)
সময়ের পরিবর্তনে জীবনের শিক্ষা
এই পৃথিবীকে আল্লাহ তাআলা পরিবর্তনের নিয়মের ওপর প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সুখের পর দুঃখ, দুঃখের পর সুখ, শক্তির পর দুর্বলতা, যৌবনের পর বার্ধক্য এবং জীবনের পর মৃত্যু—এসবই তাঁর নির্ধারিত বিধান।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, “তোমরা অবশ্যই এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় উত্তীর্ণ হবে।” (সুরা ইনশিকাক : ১৯)
একটি ঋতু আসে, মানুষ তার জন্য প্রস্তুতি নেয়; একটি উৎসব আসে, মানুষ আনন্দে মেতে ওঠে। কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সেসব স্মৃতিতে পরিণত হয়। যারা একদিন একত্রে ছিল, তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। যে ঘর একসময় মানুষের পদচারণায় মুখর ছিল, একদিন তা নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে।
জীবনের এই বাস্তবতাগুলো আমাদের শেখায়—পৃথিবী চিরস্থায়ী আবাস নয়; বরং এটি একটি পরীক্ষা কেন্দ্র, যেখানে প্রতিটি মানুষকে তার কর্মের হিসাব দিতে হবে।
দিন-রাতের পরিবর্তনে আল্লাহর নিদর্শন
চিন্তাশীল মানুষ দিন ও রাতের পরিবর্তনের মধ্যেও আল্লাহর অসংখ্য নিদর্শন খুঁজে পায়। মহান আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে এবং দিন ও রাতের পরিবর্তনে বোধসম্পন্ন লোকদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।” (সুরা আলে ইমরান : ১৯০)
এরপর আল্লাহ তাঁদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছেন—“যারা দাঁড়িয়ে, বসে এবং শুয়ে আল্লাহকে স্মরণ করে।” (সুরা আলে ইমরান : ১৯১)
প্রকৃত মুমিন তাই সময়ের পরিবর্তনকে কেবল একটি স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে দেখে না; বরং তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে নিজের আমল ও জীবনকে নতুন করে মূল্যায়ন করে।
নতুন হিজরি বছর: আত্মসমালোচনার সুবর্ণ সুযোগ
একটি বছর বিদায় নিয়েছে, আরেকটি বছর শুরু হয়েছে। নতুন হিজরি বছর শুধু নতুন ক্যালেন্ডারের সূচনা নয়; এটি নতুন করে জীবন গঠনের এক অনন্য সুযোগ।
এই সময় একজন মুমিন নিজেকে প্রশ্ন করতে পারে—গত বছরে আমি কী অর্জন করেছি? আমার সালাত, কোরআন তিলাওয়াত ও ইবাদতের অবস্থা কেমন ছিল? আমি কত মানুষের উপকার করেছি? কত পাপ থেকে তাওবা করেছি? যদি আজই মৃত্যুর ডাক আসে, আমি কি প্রস্তুত?
আল্লাহ তাআলা বলেন, “যেদিন প্রত্যেক ব্যক্তি তার কৃত ভালো ও মন্দ কাজ সামনে উপস্থিত পাবে।” (সুরা আলে ইমরান : ৩০)
তাই নতুন বছরের সূচনা হওয়া উচিত আন্তরিক তাওবা, ইস্তিগফার এবং নেক আমলের দৃঢ় অঙ্গীকারের মাধ্যমে।
ডিজিটাল যুগে সময় অপচয়ের ভয়াবহতা
প্রযুক্তিনির্ভর এই যুগে সময় অপচয় মানুষের অন্যতম বড় সংকটে পরিণত হয়েছে। স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের অজান্তেই তার জীবনের অমূল্য সময় গ্রাস করছে।
একটি নোটিফিকেশন থেকে আরেকটি ভিডিও, একটি পোস্ট থেকে আরেকটি বিতর্ক—এভাবেই দিনের পর দিন মূল্যবান সময় হারিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে অনেকেই কোরআন তিলাওয়াত, জ্ঞানার্জন, পরিবারকে সময় দেওয়া, আত্মউন্নয়ন এবং সমাজের কল্যাণে কাজ করার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “দুটি নিয়ামতের ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত—সুস্বাস্থ্য ও অবসর সময়।” (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৪১২)
সময়ের মূল্য উপলব্ধির আহ্বান
নতুন হিজরি বছর আমাদের সামনে একটি নতুন সুযোগ নিয়ে এসেছে। অতীতের ভুলত্রুটির জন্য আন্তরিক তাওবা করা, মহররম ও আশুরার ফজিলতপূর্ণ আমল পালন করা এবং সময়ের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা আজ আমাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
আসুন, আমরা ডিজিটাল বিভ্রান্তি থেকে নিজেদের রক্ষা করি এবং প্রতিটি দিনকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের নতুন সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করি। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে নেক আমলে সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করি।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সময়ের মূল্য উপলব্ধি করার, জীবনকে কল্যাণকর কাজে ব্যয় করার এবং উত্তম পরিণতি লাভের তাওফিক দান করুন। আমিন।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।



