ধর্ম ডেস্ক : বাংলাদেশে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিদের অবৈধভাবে সম্পদ অর্জনের বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। এটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে নানান আলোচনা-সমালোচনা হতে দেখা যাচ্ছে।

ঘুস

Advertisement

যদিও বিশ্লেষকরা বলছেন, কেবল সরকারি চাকরিজীবীরাই নয়, বরং অন্যান্য পেশার মানুষদের মধ্যেও অনেকে অবৈধভাবে অর্থ-সম্পদ উপার্জন করছেন।

অনেকে সেই অর্থ আবার ধর্মীয় কাজে ব্যবহার করছেন, যা নিয়ে কেউ কেউ আপত্তিও তুলছেন।

কিন্তু ধর্মগুলো কি অবৈধ আয়কে সমর্থন করে? ইসলাম, বৌদ্ধ, হিন্দু এবং খ্রিষ্ট ধর্মে এ বিষয়ে কী বলা আছে?

ইসলাম কী বলে?

ইসলাম ধর্মে, অবৈধ উপার্জনকে হারাম বা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

মুসলমানদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরান এবং হাদিসে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানাচ্ছেন ইসলামি চিন্তাবিদরা।

“কোরানের একাধিক সূরায় আল্লাহ অবৈধভাবে সম্পদ উপার্জন না করার ব্যাপারে নির্দেশ দিয়েছেন, যা মেনে চলা প্রতিটি মুসলমানের কতর্ব্য,” বিবিসি বাংলাকে বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষক ড. মুহম্মদ আব্দুর রশীদ।

কোরানের সূরা নিসার ২৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “হে মুমিনগণ, তোমরা পরস্পরের মধ্যে তোমাদের ধন-সম্পদ অন্যায়ভাবে খেয়ো না।”

একই বিষয়ে বলা হয়েছে, সূরা বাকারার ১৮৮ নম্বর আয়াতে।

সেখানে বলা হচ্ছে, “আর তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অন্যের ধন অন্যায়ভাবে ভোগ করো না এবং মানুষের ধন-সম্পদের কিয়দংশ জেনেশুনে অন্যায়ভাবে ভোগ করার উদ্দেশ্যে বিচারকগণকে ঘুস হিসেবে দিও না।”

“কোরানের এসব আয়ের মাধ্যমে চুরি-ডাকাতি করা, অন্যের হক ফাঁকি বা হক নষ্ট করা, লোক ঠকানো, ঘুষ দেওয়া-নেওয়াসহ যাবতীয় অসৎ উপার্জনকে সরাসরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে,” বিবিসি বাংলাকে বলেন মি. রশীদ।

অসৎ উপার্জন নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি সৎ পথে আয় করার ব্যাপারে মুসলমানদের ধর্মীয় গ্রন্থে তাগিদ দেওয়া হয়েছে বলে জানাচ্ছেন মুসলিম পণ্ডিতরা।

কোরানে সূরা বাকারার ১৬৮ নম্বর আয়াতে এ বিষয়ে বলা হয়েছে, “হে মানবকুল! তোমরা পৃথিবীতে হালাল ও পবিত্র বস্তু ভোগ করো।”

অপর একটি সূরা মুমিনুনের ৫১ নম্বর আয়াতে বলা হচ্ছে, “হে রাসূলগণ, তোমরা পবিত্র বস্তু হতে আহার করো এবং সৎকর্ম করো। তোমরা যা করো, সে বিষয়ে আমি জানি।”

“কোরানে এই বিষয়টিকে এতটাই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে যে, নামাজ-রোজা, হজ-যাকাতের মতো হালাল বা সৎ পথে উপার্জন করাটাও আরেকটি ফরজ বা অবশ্য পালনীয় কর্তব্য বলে হাদিস শরিফে উল্লেখ করা হয়েছে,” বিবিসি বাংলাকে বলেন বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতির সভাপতি মাওলানা কাজী আবু হুরায়রা।

‘ইবাদত কবুল হয় না’

অসৎ উপায়ে জীবিকা নির্বাহ করলে সৃষ্টিকর্তা সেই ব্যক্তির প্রার্থনা গ্রহণ করেন না বলে জানাচ্ছেন ইসলামি চিন্তাবিদরা।

“কারণ হাদিসে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ পবিত্র এবং তিনি পবিত্র বস্তুকেই ভালোবাসেন বা গ্রহণ করেন,” বিবিসি বাংলাকে বলেন বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতির সভাপতি মাওলানা কাজী আবু হুরায়রা।

“কাজেই হালাল উপার্জনের সঙ্গে কারও যদি সামান্যতম হারাম উপার্জনও মিশে যায়, তাহলে তাহলে সেই ব্যক্তির ইবাদত কবুল হয় না,” বিবিসি বাংলাকে বলেন মি. হুরায়রা।

সৎ উপার্জনের মাধ্যমে প্রার্থনা কবুলের বিষয়ে প্রসিদ্ধ হাদিস গ্রন্থ মুসলিম শরিফে বর্ণিত একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেন মুসলিম পণ্ডিতরা।

সেখানে ইসলামের নবীকে উদ্ধৃত করে বলা আছে, “এক ব্যক্তি দীর্ঘ সফরে থাকা অবস্থায় এলোমেলো চুল ও ধুলিধূসরিত দেহ নিয়ে আকাশের দিকে হাত তুলে ‘হে প্রভু!’ বলে মুনাজাত করে। অথচ সে যা খায় তা হারাম, যা পান করে তা হারাম, যা পরিধান করে তা হারাম এবং হারামের দ্বারাই সে পুষ্টি অর্জন করে। তার প্রার্থনা কীভাবে কবুল হবে?”

হাদিসটিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, তখন নবীর এক সঙ্গী সাদ ইবন আবি ওয়াক্কাস বলেন, “হে আল্লাহর রসূল! আল্লাহর কাছে দোয়া করুন যেন আমার দোয়া কবুল হয়।”

এর জবাবে ইসলামের নবী বলেন, “হে সাদ! তোমার উপার্জনকে হালাল রাখো, তোমার দোয়া কবুল হবে।”

ইসলাম ধর্মমতে, মুসলমানদের মধ্যে যারা পূণ্যবান, মৃত্যুর পর তারা জান্নাতে বসবাস করবেন।

“কিন্তু হাদিসে এটা এসেছে, যে ব্যক্তি হারামের দ্বারা শরীর গঠন করেছে, তার ইবাদত কবুল হবে না এবং সে জাহান্নামে পুড়বে,” বিবিসি বাংলাকে বলেন বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতির সভাপতি মাওলানা কাজী আবু হুরায়রা।

মুসলমানদের কাছে অন্যতম প্রসিদ্ধ হাদিস গ্রন্থ বুখারী শরিফে বলা হয়েছে যে, নবী বলেছেন, “আল্লাহর কসম! তোমরা যে কেউ অবৈধভাবে কোনো কিছু গ্রহণ করবে, সে কিয়ামতের দিন তা বয়ে নিয়ে আল্লাহর সামনে হাজির হবে।”

মুসলিম পণ্ডিতরা বলছেন, অবৈধভাবে অর্জিত ওইসব ধন-সম্পদ তার মালিকের সকল অন্যায় কাজের বিরুদ্ধে স্বাক্ষ্য দিবে।

“এক্ষেত্রে তারা হারামভাবে উপার্জিত অর্থ ব্যবহার করে হজ বা অন্য কোনও ইবাদত কিংবা দান-সদকা করলেও সেগুলো কবুল হবে না,” বিবিসি বাংলাকে বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষক ড. মুহম্মদ আব্দুর রশীদ।

এ বিষয়ে একমত পোষণ করে মাওলানা কাজী আবু হুরায়রা বলছেন, “উল্টো লোক দেখানো ইবাদত করার কারণে পরকালে তাদের আরও কঠিন শাস্তি দেওয়া হবে।”

হিন্দু ধর্ম কী বলছে?

ইসলামের মতো হিন্দু ধর্মেও অবৈধ আয়কে নিষিদ্ধ করা হয়েছে বলে জানাচ্ছেন পণ্ডিতরা।

হিন্দুদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ বেদের অন্যতম জ্ঞানকাণ্ড ‘উপনিষদে’ এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. কুশল বরণ চক্রবর্তী।

“উপনিষদের একেবারে প্রথম মন্ত্রে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, কারও সম্পদে লোভ করা যাবে না এবং ত্যাগের সাথে ভোগ করতে হবে,” বিবিসি বাংলাকে বলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগের শিক্ষক মি. চক্রবর্তী।

বেদ ছাড়াও হিন্দু ধর্মের অন্যান্য গ্রস্থেও এ বিষয়ে নানান নির্দেশনা, এমনকি শাস্তির ব্যাপারেও বলা হয়েছে বলে জানান তিনি।

“যারা কারও ঘরে আগুন দেয়, খাবারে বিষ মেশায়, হত্যার জন্য অস্ত্র নিয়ে আসে এবং কারও স্ত্রী হরণ বা ধন-সম্পত্তি লুট করে নেয়, তাদেরকে গরুড় পুরাণের উত্তরখণ্ডে আততায়ী বলা হয়েছে,” বিবিসি বাংলাকে বলেন মি. চক্রবর্তী।

তিনি আরও বলেন, “তারা যদি গুরু, বালক কিংবা বেদজ্ঞ পণ্ডিত হয়ে থাকে, তারপরও তাদেরকে শাস্তি দিতে রাজার প্রতি নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এটাও বলা হয়েছে যে, এদেরকে বধ বা হত্যা করা হলেও কোনও দোষ হবে না।”

এছাড়া অবৈধ উপায়ে সম্পদ অর্জনকারী ব্যক্তিরা মৃত্যুর পরেও শান্তি পাবে না বলেও জানাচ্ছেন হিন্দু ধর্মের এই পণ্ডিত।

“মৃত্যুর পর তারা নরকে যাবেন বলে পুরানে উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি, অবৈধ অর্থ দিয়ে দান কিংবা তীর্থযাত্রার মতো কাজ করলেও তাদের পাপক্ষয় হবে না,” যোগ করেন মি. চক্রবর্তী।

বৌদ্ধ ও খ্রিষ্ট ধর্ম যা বলছে

বৌদ্ধ ও খ্রিষ্ট ধর্মেও অবৈধ আয়ের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।

গবেষকরা বলছেন, বৌদ্ধ ধর্মে যে পঞ্চশীল বা পাঁচটি অবশ্য পালনীয় নীতির কথা বলা হয়েছে, সেগুলোরই একটি হচ্ছে ‘অদত্ত বস্তু গ্রহণ থেকে বিরত থাকা’।

“অর্থ্যাৎ যা আমার প্রাপ্য নয় বা যা আমি অর্জন করিনি, সেটি নেওয়া বা ভোগ করা যাবে না,” বলছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পালি অ্যান্ড বুদ্ধিস্ট স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষক ড. দীলিপ কুমার বড়ুয়া।

তিনি আরও বলেন, “যেসব কাজ অবৈধ বা যাতে কারও মানুষ বা অন্যান্য জীবের ক্ষতি হয়, সেগুলোর সবই বৌদ্ধ ধর্মে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।”

উপরের ধর্মগুলোর মতো খ্রিষ্ট ধর্মও অবৈধ উপার্জনকে সমর্থন করে না বলে বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন ঢাকার কাফরুল ক্যাথলিক চার্চের ধর্ম যাজক ড. প্রশান্ত টি রিবেরু।

মেয়ের পরকীয়ার বলি সাবেক এমপি খান মজলিসের স্ত্রী সেলিনা

খ্রিষ্ট ধর্মের পবিত্র গ্রন্থ বাইবেলের আদি পুস্তকের বরাত দিয়ে পণ্ডিতরা বলছেন, সেখানে ঘুসের বিষয়ে সতর্ক করে সৃষ্টিকর্তা আদেশ দিয়েছেন, “এবং তুমি কোনও উপহার গ্রহণ করবে না। কারণ উপহার জ্ঞানীদেরকে অন্ধ করে দেয়।”

খ্রিষ্ট ধর্মে এটাও বলা হয়েছে যে, অর্থ-সম্পদের প্রতি ভালোবাসা অনেক অকল্যাণের মূল।

কাজেই এটি থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন এ ধর্মের পণ্ডিতরা। সূত্র : বিবিসি

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Tarek Hasan is a professional journalist and currently works as a sub-editor at Zoom Bangla News. With six years of experience in journalism, he is an experienced writer with a strong focus on accuracy, clarity, and editorial quality. His work contributes to delivering reliable and engaging news content to digital audiences.