রমজান শেষপ্রান্তে এসে দাঁড়ালে মুমিনের হৃদয়ে এক ধরনের দ্বৈত অনুভূতি জন্ম নেয়; বিদায়ের বেদনা আর আগত ঈদের আনন্দ। কিন্তু এই আনন্দ কোনো একক ব্যক্তির অনুভূতি নয়; এটি একটি সামাজিক অনুভূতি, যেখানে নিজের সুখের সঙ্গে অন্যের হক জড়িয়ে থাকে। তাই ঈদের আগে মুমিন জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে; আমি কি শুধু নিজের জন্য আনন্দ প্রস্তুত করছি, নাকি সমাজের প্রতিটি মানুষের জন্যও ঈদের পথ সহজ করছি?

সামাজিক

Advertisement

ইসলাম ঈদকে কেবল উৎসব হিসেবে দেখেনি; বরং এটিকে সামাজিক ভারসাম্য ও সহমর্মিতার এক অনন্য উপলক্ষ বানিয়েছে। এজন্যই ঈদের আগে সদকাতুল ফিতর ফরজ করা হয়েছে।

হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) সদকাতুল ফিতর নির্ধারণ করেছেন “রোজাদারের অপ্রয়োজনীয় কথা ও অশ্লীলতা থেকে পবিত্র করার জন্য এবং দরিদ্রদের খাদ্যের ব্যবস্থা হিসেবে” (সুনান আবু দাউদ, হাদিস ১৬০৯)। এই একটি বিধানেই স্পষ্ট হয় যে, ঈদের আনন্দ যেন ধনী-গরিবের ব্যবধান তৈরি না করে; বরং সবাইকে একই আনন্দের স্রোতে শামিল করে।
আজকের সমাজে আমরা প্রায়ই দেখি, ঈদের প্রস্তুতি বলতে নতুন পোশাক, কেনাকাটা, বাহ্যিক আয়োজনকেই প্রধান মনে করা হয়। অথচ একজন মুমিনের দৃষ্টিতে ঈদের প্রস্তুতি শুরু হয় অন্য জায়গা থেকে; তার আশপাশের অভাবী মানুষগুলোর খোঁজ নেওয়া থেকে।

কে নতুন কাপড় কিনতে পারছে না, কার ঘরে খাবারের সংকট, কোন পরিবারটি নীরবে কষ্টে দিন কাটাচ্ছে; এই খোঁজ নেওয়াই প্রকৃত ঈদ প্রস্তুতির অংশ। কারণ ইসলামের শিক্ষা হলো, নিজের জন্য যা ভালোবাসো, তা-ই অন্যের জন্যও ভালোবাসো (বুখারি, হাদিস ১৩)।
ঈদের আগে আরেকটি বড় সামাজিক দায়িত্ব হলো সম্পর্কের জট খুলে দেওয়া। মনোমালিন্য, অভিমান, দূরত্ব; এসব নিয়ে ঈদের চাঁদ দেখা মুমিনের শোভা পায় না।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি ক্ষমা করে, আল্লাহ তার মর্যাদা বৃদ্ধি করেন” (সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৫৮৮)। তাই ঈদের আগে ক্ষমা চাওয়া ও ক্ষমা করে দেওয়ার মধ্যেই লুকিয়ে আছে হৃদয়ের প্রকৃত প্রশান্তি। অনেক সময় একটি ফোনকল, একটি আন্তরিক বার্তা বা একটি সাক্ষাৎ; ভাঙা সম্পর্ককে জোড়া লাগাতে পারে, যা কোনো বস্তুগত উপহার দিয়ে সম্ভব নয়।
একইসঙ্গে, সমাজের দুর্বল ও প্রান্তিক মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধও এই সময় নতুন করে জাগ্রত হওয়া উচিত। এতিম, পথশিশু, বৃদ্ধ, অসুস্থ; এরা যেন ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত না হয়।

কোরআনে আল্লাহ তাআলা বারবার দুর্বলদের অধিকার রক্ষার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, এবং বাস্তব জীবনে এর প্রতিফলন ঘটানোর সবচেয়ে উপযুক্ত সময়গুলোর একটি হলো ঈদের প্রাক্কাল।
ঈদের আনন্দে সংযমও একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বার্তা। ইসলাম আনন্দকে বৈধতা দিয়েছে, কিন্তু অপচয় ও অহংকারকে নিরুৎসাহিত করেছে। কোরআনে বলা হয়েছে, “খাও, পান কর, কিন্তু অপচয় করো না” (সুরা আ‘রাফ, আয়াত : ৩১)। আজ যখন সমাজে প্রদর্শনমূলক ভোগ-বিলাস বাড়ছে, তখন একজন সচেতন মুমিনের দায়িত্ব হলো নিজের আনন্দকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করা, যাতে তা অন্যের কষ্টের কারণ না হয়, বরং সহমর্মিতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।

ঈদ মানে কেবল নতুন পোশাক নয়; এটি একটি নতুন হৃদয়ের সূচনা। রমজান আমাদের যে তাকওয়া, সংযম ও সহানুভূতির শিক্ষা দিয়েছে, ঈদের আগে সেই শিক্ষাকে সমাজে ছড়িয়ে দেওয়াই মুমিন জীবনের প্রকৃত দায়িত্ব। যদি আমাদের আশপাশের মানুষগুলো আমাদের কারণে একটু স্বস্তি পায়, যদি কোনো অভাবী পরিবার আমাদের সহায়তায় ঈদের দিন হাসতে পারে, যদি কোনো ভাঙা সম্পর্ক জোড়া লাগে; তাহলেই আমাদের ঈদ অর্থবহ হবে।

শেষ পর্যন্ত, ঈদের আগে মুমিনের সবচেয়ে বড় সামাজিক দায়িত্ব হলো; নিজের আনন্দকে সবার আনন্দে রূপান্তর করা। কারণ ইসলামের দৃষ্টিতে সত্যিকারের সুখ সেই, যা ভাগ করে নেওয়া যায়; আর সত্যিকারের ঈদ সেই, যেখানে কেউ বঞ্চিত থাকে না।

লেখক: মুফতি সাইফুল ইসলাম

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Mynul Islam Nadim is a journalist at Zoom Bangla News, contributing to news writing and editorial support. He is involved in refining content to ensure accuracy, clarity, and consistency for digital platforms. His work reflects a commitment to responsible journalism and audience-focused reporting.