হিংসুক ও বিদ্বেষপরায়ণ মানুষ কখনো প্রকৃত শান্তি লাভ করতে পারে না। তার জীবনে সত্যিকারের বন্ধু জোটে না, মনে সর্বদা অস্থিরতা ও হতাশা বিরাজ করে। তার অন্তর যেন জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড, যেখান থেকে ষড়যন্ত্র, প্রতারণা ও মিথ্যাচারের স্ফুলিঙ্গ নিরন্তর ছড়িয়ে পড়ে। সে নিজেকে বিজয়ী মনে করলেও প্রকৃতপক্ষে সে-ই সবচেয়ে বড় পরাজিত। নিজেকে সাহসী ভাবলেও বাস্তবে সে ভীরুতার পরিচয় দেয়।

হিংসা কী?
হিংসা হলো মহান আল্লাহ অন্য কাউকে যে নিয়ামত দান করেছেন, তা নষ্ট হয়ে যাক—এমন কামনা করা এবং নিজে তা না পাওয়ার কারণে কষ্ট অনুভব করা। হিংসার সঙ্গে বিদ্বেষের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। একজন হিংসুক ব্যক্তি সবসময় অন্যের অকল্যাণ কামনা করে।
মুমিনদের প্রতি মুনাফিকদের মনোভাব সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন, *“যদি তোমাদের কোনো কল্যাণ স্পর্শ করে, তাতে তারা কষ্ট পায়; আর যদি তোমাদের কোনো অকল্যাণ হয়, তাতে তারা আনন্দিত হয়।”* (সুরা আলে ইমরান : ১২০)
অনেক মানুষের মধ্যে হিংসা এমনভাবে গেঁথে যায় যে তা তাদের স্বভাবের অংশ হয়ে দাঁড়ায়। তারা সবকিছুতেই নিজেদের অধিকারের দাবিদার মনে করে এবং নিজেদের বঞ্চিত ভাবতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। অথচ আল্লাহ প্রদত্ত অগণিত নিয়ামতের প্রতি তাদের কোনো কৃতজ্ঞতা থাকে না।
হিংসার ক্ষতি থেকে বাঁচার উপায়
হিংসুক মানুষের অনিষ্ট থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করা জরুরি। বিশেষ করে সুরা ফালাক ও সুরা নাস নিয়মিত পাঠ করা উচিত। আল্লাহ তাআলা বলেন, *“আর হিংসুকের অনিষ্ট থেকে, যখন সে হিংসা করে।”* (সুরা ফালাক : ৫)
হিংসা প্রথমে নিজেকেই ধ্বংস করে
হিংসা ও বিদ্বেষ অন্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করার আগেই হিংসুক ব্যক্তির নিজের জীবনকে অশান্ত করে তোলে। আল্লাহ তাআলা বলেন, *“বলে দাও, তোমরা তোমাদের ক্রোধ নিয়েই মরো। নিশ্চয়ই আল্লাহ অন্তরের গোপন বিষয় সম্পর্কে সম্যক অবগত।”* (সুরা আলে ইমরান : ১১৯)
আল্লাহ মানুষকে সম্পদ, জ্ঞান, মর্যাদা ও সামর্থ্যে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানে রেখেছেন পরীক্ষার জন্য। তাই একজন মুসলমানের দায়িত্ব হলো অন্যের কল্যাণ কামনা করা এবং হৃদয়কে হিংসা-বিদ্বেষমুক্ত রাখা।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, *“তোমরা পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না, একে অন্যের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করো না, হিংসা করো না; বরং আল্লাহর বান্দা হিসেবে ভাই ভাই হয়ে থাকো।”* (তিরমিজি : ১৯৩৫)
হিংসুকের হিংসা কখনো কারো ভাগ্য বা আল্লাহর দেওয়া নিয়ামত কেড়ে নিতে পারে না। বরং হিংসার আগুনে দগ্ধ হতে হতে হিংসুক নিজেই ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যায়। তার নেক আমলও নষ্ট হয়ে যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, *“তোমরা হিংসা থেকে বেঁচে থাকো। কারণ হিংসা নেক আমলকে এমনভাবে গ্রাস করে, যেমন আগুন কাঠকে ভস্ম করে দেয়।”* (আবু দাউদ : ৪৯০৫)
হিংসার ঐতিহাসিক উদাহরণ
**শয়তান ও আদম (আ.)**
আদম (আ.)-এর মর্যাদা দেখে শয়তান হিংসায় অন্ধ হয়ে যায়। আল্লাহর নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও সে সিজদা করতে অস্বীকার করে এবং অহংকারের কারণে চিরতরে জান্নাত থেকে বিতাড়িত হয়।
**কাবিল ও হাবিল**
হিংসার বশবর্তী হয়ে কাবিল তার ভাই হাবিলকে হত্যা করে, যা মানবজাতির ইতিহাসে প্রথম হত্যাকাণ্ড।
**ইহুদিদের বিদ্বেষ**
শেষ নবী (সা.) তাদের বংশে জন্মগ্রহণ না করায় অনেক ইহুদি বিদ্বেষে আক্রান্ত হয় এবং সত্য জানার পরও তাঁকে অস্বীকার করে।
**আবু জাহল**
মহানবী (সা.)-এর সত্যবাদিতা সম্পর্কে অবগত থাকা সত্ত্বেও নেতৃত্ব হারানোর ভয়ে এবং গোত্রগত অহংকারের কারণে সে ইসলাম গ্রহণ করেনি।
**নবী ইউসুফ (আ.)**
পিতার অধিক স্নেহ লাভ করায় ইউসুফ (আ.) তাঁর ভাইদের হিংসার শিকার হন। তাদের ষড়যন্ত্রের ঘটনা পবিত্র কোরআনের সুরা ইউসুফে বিস্তারিত বর্ণিত হয়েছে।
হিংসুকের অনিষ্ট থেকে মুক্তির উপায়
১. আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করা এবং কোরআন-হাদিসে বর্ণিত দোয়াগুলো নিয়মিত পাঠ করা।
২. অন্যায় ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সামর্থ্য অনুযায়ী প্রতিরোধ গড়ে তোলা।
৩. সত্যকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা এবং হিংসুক ও বিদ্বেষী লোকদের থেকে দূরে থাকা।
আল্লাহ তাআলা বলেন, *“তোমরা তাদের ক্ষমা করো এবং উপেক্ষা করে চলো, যতক্ষণ না আল্লাহ তাঁর নির্দেশ দেন।”* (সুরা বাকারা : ১০৯)
হিংসা মানুষের অন্তরকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে এবং তাকে আত্মবিনাশের পথে নিয়ে যায়। তাই প্রত্যেক মুমিনের উচিত নিজের হৃদয়কে হিংসা, বিদ্বেষ ও অহংকার থেকে পবিত্র রাখা এবং অন্যের কল্যাণ কামনা করা।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হিংসা ও বিদ্বেষমুক্ত জীবনযাপনের তাওফিক দান করুন। আমিন।
**— মাওলানা সাখাওয়াত উল্লাহ**
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।



