কোরবানি ইসলামি শরিয়তের একটি গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক ইবাদত। পৃথিবীর প্রথম মানব ও নবী হজরত আদম (আ.) থেকে শুরু করে সব যুগে কোরবানি ছিল। তবে তা আদায়ের পন্থা এক ছিল না। শেষ নবী হজরত মোহাম্মাদ (সা.)-এর উম্মতের জন্য কোরবানি ইবরাহিম (আ.)-এর সুন্নত। সেখান থেকেই এটি এসেছে।

কোরবানি ওয়াজিব

Advertisement

ইসলামে, হিজরী ক্যালেন্ডারের ১২ তম চন্দ্র মাসের জিলহজ্জ মাসের ১০ তারিখ সকাল থেকে ১২ তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত কোরবানি করার সময় হিসেবে নির্ধারিত। এ দিনে বিশ্ব জুড়ে মুসলমানরা কোরবানি দেয় যার অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালার খুশীর জন্য নির্দিষ্ট দিনে একটি পশুকে জবেহ করা। আগামী ২৮ মে বাংলাদেশে কোরবানির ঈদ উদযাপন করা হবে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে—‘তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশে নামাজ আদায় করো ও পশু কোরবানি করো।’ (সুরা : কাউসার, আয়াত : ২) কোরবানির রক্ত প্রবাহিত করার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জিত হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না উহার (জন্তুর) গোশত এবং রক্ত, বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া।’ (সুরা : হজ, আয়াত : ৩৭)

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকার পরও কোরবানি করে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের কাছে না আসে।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩১২৩)

উম্মুল মুমিনীন হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলু (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘কোরবানির দিনের আমলগুলোর মধ্য থেকে পশু কোরবানি করার চেয়ে কোনও আমল আল্লাহ তাআলার কাছে অধিক প্রিয় নয়। কেয়ামতের দিন এই কোরবানিকে তার শিং, পশম ও ক্ষুরসহ উপস্থিত করা হবে। আর কোরবানির রক্ত জমিনে পড়ার আগেই আল্লাহ তাআলার কাছে কবুল হয়ে যায়। সুতরাং তোমরা সন্তুষ্টচিত্তে কোরবানি করো।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস: ১৪৯৩)

আল্লাহ তাআলার নৈকট্য অর্জনের অনন্য মাধ্যম কোরবানি। জাকাতের মতো নেসাব পরিমাণ সম্পদ থাকলে কোরবানি দিতে হয়। তবে, বেশির ভাগের মতে—রাসুল (সা.) তাদের কোরবানি দিতে বলেছেন, যাদের ঈদের দিনের সব অভাব পূরণ করার পর পশু জবাইয়ের জন্যও অতিরিক্ত অর্থ থাকে। তারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোরবানি করবে। মানে সামর্থ্য থাকলে কোরবানি করবে। এটাকে সালাতের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। যেমন—সামর্থ্য থাকলে সালাত আদায় করতে হবে, তেমনি আর্থিক সামর্থ্য থাকলে কোরবানি করবে। সুতরাং কোরবানি করার সামর্থ্য থাকলেই করবেন। এটাই নিয়ম। কিন্তু কী পরিমাণ সম্পদ বা টাকা থাকলে কোরবানি করা আবশ্যক?

প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন কোনও পুরুষ কিংবা নারী যদি ১০ জিলহজ ফজর থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনের অতিরিক্ত নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হন, তাহলে তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব।

কোরবানির নেসাবের ক্ষেত্রে হিসাবযোগ্য পণ্য হলো— টাকা-পয়সা, সোনা-রুপা, অলংকার, বসবাস ও খোরাকির প্রয়োজন আসে না, এমন জমি, প্রয়োজনের অতিরিক্ত বাড়ি-গাড়ি, ব্যবসায়িক পণ্য ও অপ্রয়োজনীয় সব আসবাব।

আর নেসাবের পরিমাণ হলো— স্বর্ণের ক্ষেত্রে সাড়ে সাত (৮৭ দশমিক ৪৮ গ্রাম) ভরি, রুপার ক্ষেত্রে সাড়ে ৫২ (৬১২ দশমিক ৩৬ গ্রাম) ভরি এবং টাকা-পয়সা ও অন্যান্য বস্তুর ক্ষেত্রে নিসাব হলো— এর মূল্য সাড়ে ৫২ ভরি রুপার মূল্যের সমপরিমাণ হতে হবে।

সোনা বা রুপা কিংবা টাকা-পয়সা এগুলোর কোনও একটি যদি পৃথকভাবে নেসাব পরিমাণ না থাকে কিন্তু প্রয়োজনের অতিরিক্ত একাধিক বস্তু মিলে সাড়ে ৫২ তোলা রুপার মূল্যের সমপরিমাণ হয়ে যায়, তাহলেও তার ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব।

২৬ মে (মঙ্গলবার) বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাজুস) দর অনুযায়ী সাড়ে সাত ভরি ২২ ক্যারেট সোনার দাম হলো ১৭ লাখ ৮৫ হাজার ৯০৭ টাকা এবং ৫২ দশমিক ৫ তোলা ২২ ক্যারেট রুপার দাম হলো ৩ লাখ ৩ হাজার ১৩৫ টাকার মতো। (এখানে অলংকার হিসেবে দাম ধরা হয়নি। কারণ, এ ক্ষেত্রে অলংকার তৈরির মজুরি অন্তর্ভুক্ত থাকে। কিন্তু কোরবানি ওয়াজিব হয় শুধু রুপার ওপর। এ জন্য রুপার বিস্কুটের দাম ধরা হয়েছে)। তবে কোরবানি ওয়াজিব হয় ১০ জিলহজ ফজর থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে সাড়ে ৫২ ভরি রুপার যে দাম থাকবে, তার ওপর ভিত্তি করে।

কোরবানির পশু কেমন হবে

কোরবানির পশু দোষ-ত্রুটিমুক্ত হতে হবে। পশুর যেসব দুর্বলতার কারণে কোরবানি দেওয়া যাবে না, তা এখানে তুলে ধরা হলো—অন্ধ, বধির, অত্যন্ত দুর্বল ও জীর্ণ-শীর্ণ, জবাইয়ের স্থান পর্যন্ত হেঁটে যেতে অক্ষম, লেজের বেশির ভাগ অংশ কাটা, জন্মগতভাবে কান না থাকা, কানের বেশির ভাগ কাটা, গোড়াসহ শিং উপড়ে যাওয়া, পাগল হওয়ার কারণে ঘাস-পানি ঠিকমতো না খাওয়া, বেশির ভাগ দাঁত না থাকা, রোগের কারণে স্তনের দুধ শুকিয়ে যাওয়া, ছাগলের দুটি দুধের যেকোনও একটি কাটা হওয়া, গরু বা মহিষের চারটি দুধের যেকোনও দুটি কাটা হওয়া।

কোরবানি পশুর বয়স

উট কমপক্ষে পাঁচ বছরের হতে হবে। গরু ও মহিষ কমপক্ষে দুই বছরের হতে হবে। আর ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা কমপক্ষে এক বছরের হতে হবে। তবে ভেড়া ও দুম্বা যদি এক বছরের কিছু কমও হয়, কিন্তু এমন হৃষ্টপুষ্ট যে দেখতে এক বছরের মতো মনে হয়, তাহলে তা দ্বারা কোরবানি করা জায়েজ। অবশ্য এ ক্ষেত্রে কমপক্ষে ছয় মাস বয়সী হতে হবে। তবে ছাগলের বয়স এক বছরের কম হলে তা দ্বারা কোরবানি জায়েজ হবে না। আর নর-মাদা উভয় পশুই কোরবানি করা যায়।

এক পশুতে কতজন শরিক হতে পারবে

একটি ছাগল, ভেড়া বা দুম্বা দ্বারা শুধু একজনই কোরবানি দিতে পারবেন। এমন একটি পশু দুই বা ততোধিক ব্যক্তি মিলে কোরবানি করলে কারোরই সহি হবে না। আর উট, গরু, মহিষে সর্বোচ্চ সাতজন শরিক হতে পারবে। সাতের অধিক শরিক হলে কারও কোরবানি সহি হবে না।

হজরত জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসুল (সা.) আমাদের নির্দেশ করেছেন যে আমরা একটি গরু এবং একটি উটে সাতজন করে শরিক হয়ে যাই। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১২১৮) আর সাতজনে মিলে কোরবানি করলে সবার অংশ সমান হতে হবে। কারও অংশ এক সপ্তমাংশের কম হবে না। যেমন: কারও আধা ভাগ, কারও দেড় ভাগ—এমন হলে কোনও শরিকের কোরবানি সহি হবে না। তবে একজন একাধিক ভাগ নিতে পারবেন।

কোরবানির পশুতে আকিকা হবে কি

কোরবানির গরু, মহিষ ও উটে আকিকার নিয়তে শরিক হওয়া যাবে। এতে কোরবানি ও আকিকা দুটোই সহি হবে। ছেলের জন্য দুই অংশ আর মেয়ের জন্য এক অংশ দিতে হবে। শৈশবে আকিকা করা না হলে বড় হওয়ার পরও আকিকা করা যাবে। যার আকিকা সে নিজে এবং তার মা-বাবাও আকিকার মাংস খেতে পারবে। কোনও হাদিসে কোরবানির সঙ্গে আকিকা করতে নিষেধ করা হয়নি; বরং কোরবানির সঙ্গে হজে কোরবানি, জরিমানা দম একত্রে এক পশুতে দেওয়ারও প্রমাণ আছে।

কোরবানির মাংস তিন ভাগ করা কি জরুরি

কোরবানি করা এবং কোরবানির মাংস দান করা ভিন্ন দুটি আমল। সওয়াবের নিয়তে পশু জবাইয়ের দ্বারা কোরবানির ওয়াজিব আদায় হয়ে যায়। আর কোরবানির মাংস বিতরণের ব্যাপারে ইসলামে কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। তবে তা বিতরণে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। সুতরাং দান করলে সওয়াব পাওয়া যাবে।

রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘তোমরা (কোরবানির মাংস) খাও, জমা করে রাখো এবং গরিব-অসহায়দের দান করো।’ (মুসলিম শরিফ, হাদিস: ১৯৭১)। কিন্তু উত্তম হলো, মাংস তিন ভাগে ভাগ করে এক অংশ আত্মীয়দের ‘উপহার’ দেওয়া, এক অংশ গরিবদের দেওয়া এবং আরেক অংশ নিজে ও পরিবার-পরিজনের জন্য রাখা। আল্লাহর রাসুল (সা.) এটিই করতেন। (আল মুগনি, ১৩/৩৭৯)

ঋণ থাকলে কোরবানি দেওয়া যাবে কি

রদ্দুল মুহতার গ্রন্থে এসেছে, সুস্থ মস্তিষ্ক, প্রাপ্তবয়স্ক, মুসলিম নর-নারী ঋণমুক্ত থাকা অবস্থায় প্রয়োজনের অতিরিক্ত নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হলেই তার ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব। এক্ষেত্রে কোরবানি না করলে ওয়াজিব তরকের দায়ে গোনাহগার হবেন।

বাদায়েউস সানাঈ গ্রন্থে এসেছে, নাবালেগ; পাগল; যদি নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিকও হয় তাদের ওপর কোরবানি ওয়াজিব নয়। তবে তাদের অভিভাবক নিজ সম্পদ দ্বারা তাদের পক্ষে থেকে কোরবানি করলে তা বিশুদ্ধ হবে।

নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক যদি ঋণগ্রস্ত থাকেন, তাহলে তার জন্য আগে ঋণ পরিশোধ করা জরুরি। কারণ শেষ বিচারের দিন হাদিস অনুযায়ী, পাওনাদারকে নিজের নেকি দিয়ে দিতে হবে নতুবা পাওনাদারের গুনাহ কাঁধে নিয়ে জাহান্নামে যেতে হবে। এছাড়াও আব্দুলাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, যদি কোন ব্যক্তির মধ্যে গড়িমসি (দেবো-দিচ্ছি) করার অভ্যাস থাকে তবে সে দুষ্টু লোক। আর গড়িমসি করা এক প্রকারের জুলুম। (মুসান্নাফ ইবনু আবি শায়বা)।

অন্য এক হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি ঋণ করার পর মনে মনে সঙ্কল্প করে রাখে যে, সে ওই ঋণ পরিশোধ করবে না, তবে সে আল্লাহর সাথে চোর হয়ে সাক্ষাৎ করবে’ (ইবনে মাজাহ: ২৪১০)।

তাই নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক যদি কোরবানির দিনগুলোতে ঋণ পরিশোধ করার পর তার কাছে প্রয়োজনের অতিরিক্ত নেসাব পরিমাণ সম্পদ বাকি না থাকে, তাহলে তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব হবে না। আর ঋণ পরিশোধের পর যদি নেসাব পরিমাণ সম্পদ বাকি থাকে, তাহলে তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব। (বাদায়েউস সানায়ে: ৪/১৯৬; ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া: ৫/২৯২)

দুররুল মুখতার গ্রন্থে এসেছে, মুসাফিরের ওপর কোরবানি ওয়াজিব নয়। মুসাফির দ্বারা উদ্দেশ্য হলো যে ব্যক্তি কমপক্ষে ৪৮ মাইল সফরের নিয়তে নিজ এলাকা ত্যাগ করেছে।

বাদায়েউস সানাঈতে এসেছে, কোরবানি ওয়াজিব হওয়ার জন্য কোরবানির ৩ দিনই মুকিম থাকা জরুরি নয়। বরং কেউ যদি এ ৩ দিনের শুরুর দিকে মুসাফির থাকে আর শেষ দিকে মুকিম হয়ে যায় তবে তার নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকলে তার কুরবানি ওয়াজিব হবে। আর কেউ যদি এ ৩ দিনের শুরুতে মুকিম থাকে এবং শেষের দিকে মুসাফির হয়ে যায় তাহলে তার ওপরে কোরবানি ওয়াজিব হবে না।’

আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে

আল্লাহতাআলা মুসলিম উম্মাহর সব নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিকদেরকে যথাযথভাবে কোরবানি আদায় করার মাধ্যমে তার নৈকট্য অর্জনের তাওফিক দান করুন।

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Shamim Reza is an experienced journalist and sub-editor at Zoom Bangla News, with over 13 years of professional experience in the field of journalism. Known for his strong writing skills and editorial insight, he contributes to producing accurate, engaging, and well-structured news content. Born and brought up in Jashore, his background and experience shape his deep understanding of social and regional perspectives in news reporting.