ধর্ম ডেস্ক : কালো গিলাফে ঢাকা আল্লাহর ঘর খানায়ে কা’বা এখন মজনু হাজিরা মৌমাছির মতো আঁকড়ে রেখেছেন। কাছে কিংবা দূর থেকে এ গিলাফের দৃশ্য দেখার সৌন্দর্য অপরূপ। হাদিস শরীফে আছে, তন্ময়চিত্তে সেদিকে তাকিয়ে থাকাও সাওয়াবের কাজ। গিলাফে কা’বা আল্লাহর ঘরের প্রতি উত্তম সম্মান প্রদর্শনের উজ্জ্বল নিদর্শন।

লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক

Advertisement

আল্লাহর ঘরকে সাজানোর ব্যাপারে এটি হচ্ছে বান্দাহর আপ্রাণ প্রচেষ্টার বাস্তব নজির। কা’বা শরীফের গিলাফের ইতিহাস খোদ কা’বা শরীফের ইতিহাস থেকেই শুরু হয়েছে। কিছুসংখ্যক ওলামার মতে, স্বয়ং হযরত ইসমাঈল (আ) নিজেই কা’বা শরীফের গিলাফ পরিয়েছিলেন। অবশ্য অন্য এক ঐতিহাসিক বর্ণনায় বলা হয় যে, ইয়েমেনের শাসক তৃতীয় তুব্বা’ কা’বা শরীফে প্রথম গিলাফ পরান।

মক্কায় খোযাআ’ গোত্রের শাসনামলে, ইয়েমেনের শাসক ১ম তুব্বা’ সৈন্য সামন্ত নিয়ে কা’বা শরীফ ধ্বংস করতে এসে নিজেই ধ্বংস হয়। এর পর দ্বিতীয় তুব্বা’ কা’বা শরীফ ধ্বংস করতে এসে কোরাইশদের হাতে পরাজিত হয়। তারপর ৩য় তুব্বা’ যাকে ‘তুব্বা আল হোমায়রী’ও বলা হয়, সে কা’বা শরীফ ধ্বংসের উদ্দেশ্যে এবং এর ধনভা-ার আত্মসাতের জন্য অগ্রসর হয়।

কিন্তু সে এবং তার সৈন্যরা হঠাৎ করে প্রচ- তুফানের সম্মুখীন হয় এবং অগ্রাভিযানে বাধাপ্রাপ্ত হয়। তারপর তারা কঠিন রোগ- শোকে আক্রান্ত হয়। এটি ছিল আল্লাহর গজব। তার সঙ্গে যে ধর্মযাজক ছিল সে বাদশাকে ওই অভিযান বন্ধের পরামর্শ দেন এবং কা’বা শরীফকে সম্মান প্রদর্শন করা, এর তাওয়াফ করা ও নিজ মাথা মুড়ানোর উপদেশ দেয়।

এরপর বাদশাহ ওই পরামর্শ মেনে নেন এবং মক্কায় ছয়দিন পর্যন্ত অবস্থান করে। তিনি ওই সময় খুবই সুন্দর এবং সর্বোচ্চ মানের কাপড় সংগ্রহ করে গিলাফ তৈরি করে কা’বা শরীফের গায়ে পরিয়ে দেন। এ জন্যই তুব্বা’ আল-হোমায়রীকে কা’বা শরীফে প্রথম গিলাফ পরানোকারী বলা হয়। – (মক্কা শরীফের ইতিকথা, এএনএম সিরাজুল ইসলাম)।

জাহেলিয়াতের যুগে বহু লোক কা’বা শরীফে গিলাফ পরিয়েছেন। তারা এটাকে দীনি ওয়াজিব মনে করত। মক্কা বিজয়ের পর রাসূলুল্লাহ (স.) কা’বা শরীফে গিলাফ পরানোর কাজকে বহাল রাখলেন। একজন মহিলা কা’বা শরীফে সুঘ্রাণযুক্ত ধোঁয়া দেওয়ার সময় গিলাফে আগুন ধরে গিলাফটি পুড়ে যায়। তখন নবী করীম (স.) ইয়েমেনী কাপড় দ্বারা কা’বা শরীফের গিলাফ লাগান।

সৌদি সরকারের শাসন শুরুর পর বাদশাহ আবদুল আজিজ আল-সউদ ১৩৪৬ হিজরির মহরম মাসে মক্কায় একটি বিশেষ গিলাফ নির্মাণ কারখানা প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেন। ওই বছরের মাঝামাঝি গিলাফ তৈরির কারখানা প্রতিষ্ঠিত হয়। মক্কায় এটাই ছিল প্রথম কা’বার গিলাফ তৈরির প্রচেষ্টা। বর্তমানে খাঁটি প্রাকৃতিক সিল্ক দিয়ে কা’বার গিলাফ তৈরি করা হয়।

সিল্ককে কাল রং দিয়ে রঙিন করা হয়। পরে এতে জাকা পদ্ধতিতে, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূূলুল্লাহ, আল্লাহু জাল্লা-জালালুহু, সুবহানাল্লাহ ওয়া বিহামদিহী, সুবহানাল্লাহিল আজিম- এরূপ বাণীসমূহের নক্সা আঁকা হয়। গিলাফের উচ্চতা ১৪ মিটার। এর ওপরের তৃতীয়াংশে ৯৫ সেন্টিমিটার চওড়া নির্মিত বেল্টে (বন্ধনীতে) সংযুক্ত ত্রৈ-আক্ষরিকভাবে কুরআনের আয়াত লেখা হয়।

বন্ধনীতে ইসলামী কারুকার্য খচিত একটি ফ্রেম থাকে। বন্ধনীটি সোনার প্রলেপ দেওয়া রূপালী তারের মাধ্যমে এমব্রয়ডারি করা হয়। এই বন্ধনীটি কা’বা শরীফের চারদিকেই পরিবেষ্টিত থাকে। বন্ধনীর দৈর্ঘ্য হচ্ছে ৪৭ মিটার এবং তা ১৬টি টুকরায় বিভক্ত। বন্ধনীটির নিচে প্রতি কোনায় সুরা ইখলাসকে গোলাকার চতুর্ভূজ বৃত্তের মধ্যে ইসলামী ডিজাইনের প্রতিফলন ঘটিয়ে লেখা হয়।

বন্ধনীর নিচে পৃথক পৃথক ফ্রেমে ৬টি কুরআনের আয়াত লেখা হয়। ওইগুলোর মধ্যে ব্যবধান সৃষ্টির জন্য মাঝখানে মোমবাতির আকারে ‘ইয়া হাইয়ু-ইয়া-কাইয়ুমু’ অথবা ‘ইয়া রাহমানু-ইয়া রাহীমু’ কিংবা ‘আলহামদুলিল্লাহ হি রাব্বিল আ’লামীন’ কথাগুলো লেখা থাকে। বন্ধনীর নিচে সবগুলো লেখা সংযুক্ত ত্রি-আক্ষরিকভাবে অংকিত।

এতে উপযুক্ত এমব্রয়ডারি করা হয় এবং এর ওপর সোনা ও রূপার চিকন তার লাগানো হয়। সৌদি শাসনামল থেকেই এ গিলাফের কারুকার্যে স্বর্ণের ব্যবহার শুরু হয়। এ ছাড়াও এতে ১১টি নক্সা করা মোমবাতির প্রতিকৃতি আছে। এগুলো কা’বার চার কোণে লাগানো আছে।
প্রত্যেক বছর জিলহজ মাসের ৯ তারিখে কা’বা শরীফের গায়ে নতুন গিলাফ পরানো হয়। সেদিন হজের দিন। হাজিরা সব আরাফাতের ময়দানে থাকে এবং মসজিদে হারামে মুসল্লির সংখ্যা থাকে খুবই কম। বর্তমানকালে হজ উপলক্ষে এবং স্বয়ং হজের দিনই ওই গিলাফ লাগানো হয়। হাজিরা আরাফাত থেকে ফিরে এসে কা’বা শরীফের গায়ে নতুন গিলাফ দেখতে পান।

গিলাফ নির্মাণ কারখানায় গিলাফ তৈরির পর কা’বা শরীফের গায়ে পরানোর আগে কারখানার পক্ষ থেকে তা কা’বা শরীফের চাবি রক্ষক তথা বনি শায়বা গোত্রের মনোনীত কা’বা শরীফের সেবকের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে তার অনুমোদনক্রমে সংশ্লিষ্ট সকলের সহযোগিতায় গিলাফ লাগানো হয়।

ভিসা পেয়েও হজে গেলেন না যত জন

হজের কয়েকদিন আগ থেকেই কা’বার গিলাফের নিচু অংশ ওপরের দিকে তুলে দেওয়া হয় এবং এতে কা’বা শরীফের দেওয়ালের বাইরের অংশ দেখা ও ধরা যায় আর ভক্তদের হাত থেকে গিলাফকে হিফাজত করা সম্ভব হয়। আল্লাহপাক আমাদের সকলকে সে হৃদয়কাড়া কালো গিলাফ স্পর্শ করে চোখ জুড়ানোর তাওফিক দিন।

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Tarek Hasan is a professional journalist and currently works as a sub-editor at Zoom Bangla News. With six years of experience in journalism, he is an experienced writer with a strong focus on accuracy, clarity, and editorial quality. His work contributes to delivering reliable and engaging news content to digital audiences.