মানুষের অন্তরের গভীর অনুভূতি প্রকাশের সবচেয়ে নীরব অথচ শক্তিশালী মাধ্যম হলো চোখের পানি। এটি কেবল আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং আল্লাহভীতি, আত্মসমালোচনা, বিনয় ও ভালোবাসার এক অনন্য ভাষা। একজন মুমিনের জীবনে এই অশ্রু অমূল্য সম্পদস্বরূপ—যা তাকে আল্লাহর সান্নিধ্যে পৌঁছে দেয়, গুনাহ মোচনের কারণ হয় এবং পরকালের মুক্তির পথ সুগম করে।

পানি

Advertisement

মুমিনের জীবনে চোখের পানির গুরুত্ব

কোরআন ও হাদিসে চোখের পানিকে মুমিনের বিশেষ গুণ ও পাথেয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিভিন্ন আয়াত ও নবীজি (সা.)-এর বাণী এ বিষয়ের গুরুত্ব স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।

১. প্রকৃত মুমিনের পরিচয়
আল্লাহ তাআলা বলেন,
‘তারা কাঁদতে কাঁদতে মুখের ওপর লুটিয়ে পড়ে এবং এতে তাদের বিনয় আরও বৃদ্ধি পায়।’
(সুরা বনি ইসরাঈল : ১০৯)

এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, সত্যিকার মুমিনের অন্তর এতটাই সংবেদনশীল যে আল্লাহর স্মরণে তার চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে। এ কান্না কোনো বাহ্যিক প্রদর্শন নয়; বরং অন্তরের গভীর বিনয় ও ভয় থেকেই উৎসারিত।

২. ঈমানের জীবন্ত নিদর্শন
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
‘রাসুলের প্রতি যা নাজিল হয়েছে, তা যখন তারা শোনে, তখন সত্য উপলব্ধির কারণে তুমি তাদের চোখে অশ্রু দেখতে পাবে। তারা বলে, হে আমাদের রব! আমরা ঈমান এনেছি, সুতরাং আমাদেরকে সাক্ষ্যদানকারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন।’
(সুরা মায়িদা : ৮৩)

এ আয়াতে চোখের পানিকে ঈমানের প্রকাশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। আল্লাহর বাণী হৃদয়ে পৌঁছালে মুমিনের চোখে অশ্রু ঝরে—এটাই তার ঈমানের প্রমাণ।

৩. জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
‘দুটি চোখকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে না—একটি চোখ, যা আল্লাহর ভয়ে কাঁদে; আরেকটি চোখ, যা আল্লাহর পথে পাহারা দিতে গিয়ে রাত জাগে।’
(সুনানে তিরমিজি)

এই হাদিসে আল্লাহভীতিতে ঝরা অশ্রুকে জাহান্নাম থেকে মুক্তির ঢাল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা অত্যন্ত বিরল সৌভাগ্যের সংবাদ।

৪. কিয়ামতের দিন আরশের ছায়া
আরেক হাদিসে নবীজি (সা.) বলেন,
‘যেদিন আল্লাহর আরশের ছায়া ছাড়া আর কোনো ছায়া থাকবে না, সেদিন সাত শ্রেণির মানুষ সেই ছায়ায় আশ্রয় পাবে… তাদের একজন হলো সেই ব্যক্তি, যে নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং আল্লাহভয়ে যার চোখ অশ্রুতে ভিজে যায়।’
(সহিহ বুখারি : ১৪২৩)

কিয়ামতের ভয়াবহ দিনে আল্লাহর আরশের ছায়া পাওয়া যে কত বড় নিয়ামত, তা সহজেই অনুমেয়। এ কারণেই সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর জীবন ছিল আল্লাহভীতির অশ্রুতে সিক্ত। আবু বকর (রা.) কোরআন তিলাওয়াতের সময় এত কাঁদতেন যে কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে যেত। ওমর (রা.)-এর গালে কান্নার স্পষ্ট দাগ দেখা যেত। আলী (রা.) রাতের নামাজে দাঁড়িয়ে এত অশ্রু ঝরাতেন যে তার দাড়ি ভিজে যেত। (হুলয়াতুল আউলিয়া)

হৃদয়ের কঠোরতা—একটি ভয়াবহ ব্যাধি

এর বিপরীতে অন্তরের কঠোরতা অত্যন্ত নিন্দনীয়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন,
‘এরপর তোমাদের হৃদয় কঠিন হয়ে গেল—পাথরের মতো, বরং তার চেয়েও কঠিন। অথচ পাথরের মধ্যেও এমন আছে, যেখান থেকে নদী প্রবাহিত হয়।’
(সুরা বাকারাহ : ৭৪)

এখানে কঠোর হৃদয়কে পাথরের চেয়েও নিকৃষ্ট বলা হয়েছে। কারণ পাথর থেকেও পানি বের হয়, কিন্তু কঠিন অন্তর থেকে অনুশোচনা বা আল্লাহভীতি জন্ম নেয় না। অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন,
‘ধ্বংস তাদের জন্য, যাদের হৃদয় আল্লাহর স্মরণে কঠোর হয়ে গেছে।’
(সুরা জুমার : ২২)

রাসুলুল্লাহ (সা.) কঠোর হৃদয়কে দুর্ভাগ্যের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন,
‘চারটি বিষয় মানুষকে দুর্ভাগা করে তোলে—কঠোর হৃদয়, চোখে অশ্রু না আসা, দীর্ঘ আশা এবং দুনিয়ার প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি।’
(সুনানে তিরমিজি)

যে হৃদয় কাঁদতে জানে না, সে হৃদয় আল্লাহভীতির স্বাদ থেকেও বঞ্চিত থাকে।

সবশেষে স্মরণ রাখা প্রয়োজন—চোখের পানি কোনো দুর্বলতার চিহ্ন নয়। বরং এটি মুমিনের শক্তি, সৌন্দর্য ও পাথেয়। যে চোখ আল্লাহর ভয়ে অশ্রু ঝরায়, সেই চোখ কিয়ামতের ভয়াবহতা থেকে নিরাপদ থাকে। আল্লাহ তাআলা যেন আমাদের অন্তরকে কোমল করেন, চোখে অশ্রু দান করেন এবং সেই অশ্রুকে আমাদের মুক্তির মাধ্যম বানান। আমিন।

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Mynul Islam Nadim is a journalist at Zoom Bangla News, contributing to news writing and editorial support. He is involved in refining content to ensure accuracy, clarity, and consistency for digital platforms. His work reflects a commitment to responsible journalism and audience-focused reporting.