ঈমানের প্রকৃত সৌন্দর্য প্রকাশ পায় তখনই, যখন মানুষের অন্তর হিংসা, বিদ্বেষ, অপবাদ ও প্রতারণা থেকে মুক্ত থাকে। রাসুলুল্লাহ (সা.) কেবল নামাজ-রোজা বা বাহ্যিক ইবাদতের দিকেই আহ্বান জানাননি; বরং তিনি হৃদয়ের পবিত্রতাকেই ঈমানের মূলভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেছেন। অন্যের কল্যাণ কামনা করা, কারো প্রতি বিদ্বেষ না রাখা এবং স্বচ্ছ অন্তরের অধিকারী হওয়াকে তিনি নিজের প্রিয় সুন্নাহ বলে ঘোষণা করেছেন। সাহাবায়ে কেরামের জীবন ও হাদিসের বর্ণনায় বিদ্বেষমুক্ত হৃদয়ের যে মর্যাদা উঠে এসেছে, তা জান্নাতের পথকে স্পষ্ট করে দেয়।

অন্তর

Advertisement

বিদ্বেষমুক্ত থাকা—নবীজির অনন্য সুন্নাহ

গিবত, অপবাদ, অপমান ও হিংসা ত্যাগ করে নির্মল অন্তর ধারণ করা নবীজির এক মহান সুন্নাহ। এই সুন্নাহ অনুসরণ করলে নবীজির প্রতি ভালোবাসা দৃঢ় হয়, আর তাঁর ভালোবাসাই জান্নাতের সান্নিধ্যের পথ খুলে দেয়।

আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে বলেন, “হে বৎস! তুমি যদি সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তোমার অন্তরে কারো প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ না রেখে থাকতে পারো, তবে তাই করো।” এরপর তিনি বলেন, “এটাই আমার সুন্নাহ। যে আমার সুন্নাহকে ভালোবাসে, সে আমাকেই ভালোবাসে; আর যে আমাকে ভালোবাসে, সে জান্নাতে আমার সঙ্গী হবে।”
— (মিশকাতুল মাসাবিহ, হাদিস: ১৭৫)

অন্তরের পবিত্রতা জান্নাতের পথ খুলে দেয়

মানুষের বাহ্যিক আমল খুব বেশি না হলেও যদি তার অন্তর হিংসা ও প্রতারণামুক্ত থাকে, তবে আল্লাহ তাআলা তাকে উচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করতে পারেন। আল্লাহ অন্তরের অবস্থাকেই বেশি গুরুত্ব দেন।

এক আনসারি সাহাবির ঘটনা এ বিষয়ে অত্যন্ত শিক্ষণীয়। তাঁর বিশেষ গুণ ছিল—তিনি কারো প্রতি হিংসা পোষণ করতেন না এবং আল্লাহ প্রদত্ত নিয়ামতের কারণে কাউকে ঈর্ষা করতেন না। তিনি কখনো কোনো মুসলমানকে ধোঁকা দেওয়ার চিন্তাও করতেন না।

আনাস ইবনে মালিক (রা.) বর্ণনা করেন, একদিন রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের সঙ্গে বসে বললেন, “এখন তোমাদের সামনে একজন জান্নাতি ব্যক্তি আসবে।” কিছুক্ষণ পর এক আনসারি সাহাবি আগমন করলেন। পরের দিন ও তৃতীয় দিনও একই ঘোষণা দেওয়া হয় এবং একই ব্যক্তি উপস্থিত হন।

এই রহস্য জানার জন্য আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রা.) কৌশলে তিন দিন ওই সাহাবির সঙ্গে অবস্থান করেন। তিনি দেখলেন, ওই সাহাবি বিশেষ কোনো অতিরিক্ত ইবাদত করেন না। রাতে খুব বেশি নফল ইবাদতও করেন না; তবে ঘুম ভাঙলে আল্লাহর জিকির করেন এবং সর্বদা ভালো কথা বলেন।

তিন দিন পর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “রাসুলুল্লাহ (সা.) আপনাকে জান্নাতি বলেছেন—এর বিশেষ কারণ কী?”

আনসারি সাহাবি বললেন, “আপনি যা দেখেছেন, আমল তো সেটুকুই। তবে একটি বিষয় আছে—আমি কখনো কোনো মুসলমানকে ধোঁকা দেওয়ার কথা চিন্তা করি না এবং আল্লাহ যে নিয়ামত কাউকে দিয়েছেন, সে বিষয়ে হিংসা করি না।”

তখন আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) বললেন, “এই গুণই আপনাকে সেই মর্যাদায় পৌঁছে দিয়েছে—যা অর্জন করা আমাদের জন্য কঠিন।”
— (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১২৬৯৭)

হিংসুকরা বিশেষ রাতেও ক্ষমা পায় না

হিংসা কেবল সামাজিক সমস্যা নয়; এটি আখিরাতের জন্যও মারাত্মক ক্ষতিকর। এমনকি বিশেষ ফজিলতপূর্ণ রাতেও হিংসুকদের ক্ষমা করা হয় না।

মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেন, “আল্লাহ তাআলা অর্ধ শাবানের রাতে সৃষ্টিকুলের প্রতি দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও হিংসুক ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন।”
— (সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস: ৫৬৬৫)

বিদ্বেষমুক্ত অন্তর ইসলামের সৌন্দর্যের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত এবং নবীজির প্রকৃত সুন্নাহ। বাহ্যিক আমল সীমিত হলেও যদি হৃদয় হিংসা, বিদ্বেষ ও প্রতারণা থেকে মুক্ত থাকে, তবে আল্লাহ তাআলা তাকে জান্নাতের উচ্চ মর্যাদা দান করতে পারেন। বিপরীতে হিংসা এমন এক অন্তরব্যাধি, যা মানুষকে আল্লাহর বিশেষ রহমত থেকেও বঞ্চিত করে।

তাই একজন মুমিনের কর্তব্য হলো—নিজের অন্তর পরিশুদ্ধ রাখা, অন্যের কল্যাণে আনন্দিত হওয়া এবং নবীজির এই মহান সুন্নাহকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন করা। এর মধ্যেই নিহিত রয়েছে নবীজির ভালোবাসা অর্জন ও জান্নাতে তাঁর সান্নিধ্য লাভের সৌভাগ্য।

লেখক : ড. আবু সালেহ মুহাম্মদ তোহা

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Mynul Islam Nadim is a journalist at Zoom Bangla News, contributing to news writing and editorial support. He is involved in refining content to ensure accuracy, clarity, and consistency for digital platforms. His work reflects a commitment to responsible journalism and audience-focused reporting.