আল্লাহতায়ালা পৃথিবী টিকিয়ে রেখেছেন নীল আর সবুজ দিয়ে। নীল হলো জল। সবুজ হলো গাছপালা। পৃথিবীর ৩ ভাগ জল। ১ ভাগ স্থল। স্থলের বেশির ভাগজুড়েই আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন গাছপালা। এ পৃথিবী শুধু মানুষের বসবাসের জন্যই গড়া হয়নি। এখানে আছে প্রাণিকুল। ছোট্ট পিঁপড়া থেকে শুরু করে মস্ত তিমিও এ পৃথিবীর আপনজন। কোথাও যদি পিঁপড়ারা বিপন্ন হয়, তাহলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে তার প্রভাব পড়বে কৃষি, জলাশয় সর্বোপরি মানুষের জীবনধারার ওপর।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, জাপানে পিঁপড়াদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে ভূমিকম্প সম্পর্কে পূর্বপ্রস্তুতি নেওয়া হয়। আমাদের দেশেও পোকামাকড়ের ওড়াউড়ি, পাখির ডাকাডাকি পর্যবেক্ষণ করে কৃষকরা রোদবৃষ্টির আগাম সংবাদ জানতে পারেন। এমনকি সামনের মৌসুমে ফসলের বাড়তি যত্ন নিতে হবে কি না, তা-ও বলে দেয় মাটির পোকা, বনের ঝিঁঝি। তাই নিজের স্বার্থেই মানুষকে প্রকৃতির এসব উপাদানের টিকে থাকা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
কিন্তু আমরা নিজের সুখের জন্য এমন সব ব্যবস্থার আবিষ্কার করেছি, যাতে আমাদের ও প্রাণিকুলের জীবন বিষিয়ে উঠছে। আল্লাহতায়ালা প্রাণিকুলের বসবাস উপযোগিতা বজায় রাখার দায়িত্ব মানুষের কাঁধে দিয়েছিলেন। কিন্তু আমরা সে দায়িত্ব অবহেলা করে চলছি।
আমাদের ওপর ফরজ ছিল প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রাখা। নদী পরিষ্কার রাখা। বৃক্ষ ও বন ধ্বংস না করা। কিন্তু আজ দেশের একটি নদীও দূষণমুক্ত নেই। আমরা হাতে ধরে সব খাল-জলাশয় নষ্ট করে ফেলেছি। আমরা পুকুর ভরাট করে সেখানে ঘর তুলেছি। অপ্রয়োজনীয় জঞ্জাল মনে করে বন ও গাছ উজাড় করেছি। ওই বনে যে প্রাণী থাকত, ওই গাছে যে পাখি বসত, ওই নদীতে যে মাছ বিচরণ করত, ওই পুকুরপাড়ে যে সাপ ঘর বেঁধেছিল, তাদের সবার অভিশাপ আমাদের ওপর ঝরছে।
মহান আল্লাহ আমাদের ওপর রুষ্ট হয়েছেন এভাবে প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করার কারণে। ফলে আজ হিটস্ট্রোক, ডেঙ্গু, হাম, ডায়াবেটিস, করোনা, ক্যানসারসহ জানা অজানা শারীরিক ও মানাসিক নানা ব্যাধি আমাদের ওপর চেপে বসেছে। এগুলো আসলে আল্লাহর গজব ছাড়া আর কিছুই না।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ যখনই জান্নাতের আলোচনা করেছেন, সঙ্গে সঙ্গে নদীর কথাও বলেছেন। নদী ছাড়া জান্নাতের উল্লেখ করেননি। পৃথিবীর বুকে যত সভ্যতা গড়ে উঠেছে, সব ছিল নদীকেন্দ্রিক। আল্লাহর অশেষ দয়ায় নদীমাতৃক দেশে আমাদের জন্ম হয়েছে। পৃথিবীর সব প্রেম, মমতা, সভ্যতা আল্লাহ আমাদের দান করেছিলেন নদীর মাধ্যমে। আমরা সে নদীগুলো হত্যা করে হয়েছি দুনিয়ার সবচেয়ে অসভ্য-লোভী-অসৎ জাতি। যে কারণে আজ গরমের গজব আল্লাহই আমাদের দিয়েছেন। পরিবেশবিজ্ঞান বলে, যখন কোনো জনপদের খালবিল-জলাশয় ধ্বংস হয়ে যায়, সে এলাকায় গরমের তীব্রতা বৃদ্ধি পায়।
বিষয়টি আরও সহজ করে বলা যায় এভাবে- সূর্যের তাপ সরাসরি পানিতে পড়লে পানি তাপ শোষণ করে নেয়। মাটির ওপর পড়লে মাটিও তাপ শোষণ করে নেয়। একইভাবে ইট-সুরকির বাড়িতে যখন সূর্যের তাপ পড়ে সেখানেও তাপ জমা হয়। পানি ও মাটি নিজ নিজ তাপ হজম করতে পারলেও ইট-সুরকি সেটা হজম করতে পারে না। অনেকটা উগরে দেওয়ার মতো তাপ আবার বাইরে ছেড়ে দেয় বা নিজের ভিতর ধরে রেখে চারপাশের আবহাওয়া আরও উত্তপ্ত করে রাখে।
একদিকে নগর এলাকায় জলাশয়ের পরিমাণ কমছে, অন্যদিকে ইট-সুরকির দালানকোঠা, রাস্তাঘাট বাড়ছে। ফলে সূর্যের তাপ শোষণ করার সুযোগও কমছে। যে কারণে প্রতিনিয়ত সূর্যের তাপ দ্বিগুণ ৩ গুণ হয়ে আমাদের ও প্রাণিকুলের কষ্ট বাড়িয়ে দিচ্ছে। নেমে আসছে পরিবেশ বিপর্যয়। পরিবেশ বিপর্যয় আসে কখন? সহজ উত্তর হলো যখন মানুষ পরিবেশকে আপন ভাবতে পারে না। মানুষ যত স্বার্থপরই হোক, যত খারাপই হোক, সে কখনো যাকে আপন মনে করে, তার ক্ষতি করতে পারে না। আর সত্যিকারে মুসলমানের কাছে মানুষ তো বটেই প্রকৃতির প্রতিটি উপাদানই আপন।
এ শিক্ষা পাওয়া যায় নবীজি (সা.)-এর একটি হাদিস থেকে। নবীজি (সা.) উহুদ পাহাড় সম্পর্কে বলেছেন, ‘দেখো! এ হলো মদিনা শহর। এ হলো উহুদ পাহাড়। এ আমাদের ভালোবাসে। আমরাও একে ভালোবাসি।’ (বুখারি ও মুসলিম)।
একটি নিষ্প্রাণ পাহাড় নবীজি (সা.)-কে ভালোবাসে। আবার নবীজি (সা.)সহ তাঁর সাহাবিরাও পাহাড়কে ভালোবাসেন। এ থেকে এটাই পরিষ্কার হয়, প্রকৃতির প্রতি সীমাহীন ভালোবাসা থাকা ইমানেরও দাবি। প্রকৃতিকে হত্যা করা মানে নিজের আপনজনকে হত্যা করা। আর আপনজনকে যে হত্যা করে, সে আসলে নিজেকেই হত্যা করে।
অন্য এক হাদিসে নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘যখন কোনো মুমিন মারা যায় তখন যে জমিনে সে সেজদা দিয়েছে- সেই জমিন তার জন্য কাঁদে। আসমান ও পুরো পৃথিবী তার জন্য কাঁদে। আল্লাহ আমাদের এসবের সার বার্তা বোঝার তাওফিক দিন। আমিন।’
লেখক : মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।



