শবেবরাত শব্দটি ফারসি ভাষা থেকে আগত। এখানে ‘শব’ অর্থ রাত এবং ‘বরাত’ অর্থ মুক্তি—অর্থাৎ শবেবরাত হলো মুক্তির রজনি। আরবিতে এ রাতকে বলা হয় ‘লাইলাতুল বরাত’। ‘লাইলাতুল’ মানে রাত বা রজনি এবং ‘বরাত’ মানে মুক্তি।

শবেবরাত

Advertisement

ইসলামি পরিভাষায় শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতকে শবেবরাত বলা হয়। হাদিস শরিফে এ রাতকে ‘নিসফু মিন শাবান’, অর্থাৎ শাবান মাসের মধ্যবর্তী রাত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাফসিরে জালালাইন (পৃষ্ঠা ৪১০)-এ এই রজনির চারটি নাম পাওয়া যায়—

১. আল লাইলাতুল মুবারাকাহ (বরকতময় রজনি)
২. লাইলাতুল বরাত (মুক্তির রজনি)
৩. লাইলাতুল রাহমাহ (রহমতপ্রাপ্তির রজনি)
৪. লাইলাতুস সাক (বণ্টনের রজনি)

শবেবরাতের ইবাদত ও মর্যাদা

হজরত মুহাম্মদ (সা.) এই রাত ইবাদত-বন্দেগিতে অতিবাহিত করতেন। হজরত আলী (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
“শাবান মাসের মধ্যবর্তী রাতে তোমরা জাগ্রত থেকে ইবাদত করো এবং দিনে রোজা রাখো।”
(সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১৩৮৮)

তিনি আরও বলেন, “আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে অর্ধ শাবানের রাতে ১৪ রাকাত নামাজ আদায় করতে দেখেছি।”
(তাফসিরে দুররে মানছুর, খণ্ড ২৫, পৃষ্ঠা ৪০৪)

আরেক হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন—
“শবেবরাতের রাতে আল্লাহ তায়ালা নিকটবর্তী আকাশে অবতরণ করেন এবং বলেন— কেউ ক্ষমা চাইছ কি? আমি তাকে ক্ষমা করব। কেউ রিজিক চাইছ কি? আমি তাকে রিজিক দেব। কেউ রোগাক্রান্ত আছ কি? আমি তাকে সুস্থ করে দেব। এভাবে তিনি ভোর পর্যন্ত আহ্বান জানাতে থাকেন।”
(মেশকাত শরিফ, ইবনে মাজাহ সূত্রে, পৃষ্ঠা ১১৫)

ভাগ্য নির্ধারণের রাত

হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
“এই রাতে নির্ধারিত হয় কারা জন্ম নেবে, কারা ইন্তেকাল করবে, বান্দার আমল আল্লাহর দরবারে পেশ করা হয় এবং রিজিক বণ্টন করা হয়।”
(মেশকাত শরিফ, পৃষ্ঠা ১১৫)

পবিত্র কোরআনেও এ রাতের গুরুত্ব উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন—
“এই রাতে প্রতিটি হিকমতপূর্ণ বিষয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়—এটা আমার পক্ষ থেকে নির্দেশ।”
(সুরা আদ-দুখান: আয়াত ৪-৫)

রাসুল (সা.) আরও বলেন—
“অর্ধ শাবানের রাতে মৃত্যুর ফেরেশতাকে পরবর্তী এক বছরে যাদের রুহ কবজ করা হবে, তাদের তালিকা দেওয়া হয়। অনেক সময় দেখা যায়, কেউ ঘর তৈরি করছে বা বিয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে, অথচ তার নাম মৃত্যুর তালিকায় লেখা হয়ে গেছে।”
(তাফসিরে দুররে মানছুর, খণ্ড ২৫, পৃষ্ঠা ৪০২)

হজরত ইকরামা (রা.) বলেন—
“এই রাতে পুরো এক বছরের হায়াত-মওত, হাজিদের তালিকা এবং বিভিন্ন সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়। নির্ধারিত সংখ্যার একটিও কম-বেশি হয় না।”
(তাফসিরে তারাবি, খণ্ড ২৫, পৃষ্ঠা ১০৯)

চারটি বিশেষ রাত

হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
“আল্লাহ তায়ালা চারটি রাতে রহমতের দরজা উন্মুক্ত করে দেন—
১. ঈদুল আজহার রাত
২. ঈদুল ফিতরের রাত
৩. শবেবরাতের রাত (যেদিন হায়াত ও রিজিক নির্ধারিত হয়)
৪. আরাফার রাত (ফজর পর্যন্ত)”
(তাফসিরে দুররে মানছুর, খণ্ড ২৫, পৃষ্ঠা ৪০২)

কারা ক্ষমা থেকে বঞ্চিত

শবেবরাতের রাতে আল্লাহ তায়ালা অধিকাংশ মানুষকে ক্ষমা করলেও কিছু শ্রেণির মানুষ এই ক্ষমা থেকে বঞ্চিত থাকে। রাসুল (সা.) বলেছেন—
“মুশরিক ও হিংসুক ছাড়া সবাইকে আল্লাহ ক্ষমা করে দেন।”
(মেশকাত শরিফ, ইবনে মাজাহ সূত্রে)

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) বলেন—
“এই রাতে দুই শ্রেণির মানুষ ক্ষমা পায় না—হিংসুক এবং হত্যাকারী।”
(মুসনাদে আহমদ সূত্রে মেশকাত শরিফ)

অতএব, শবেবরাতের রাত আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা, তওবা, নামাজ, কোরআন তেলাওয়াত ও ইবাদতের মাধ্যমে অতিবাহিত করা একজন মুমিনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ড. মুহাম্মদ নাছিরউদ্দীন সোহেল

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Mynul Islam Nadim is a journalist at Zoom Bangla News, contributing to news writing and editorial support. He is involved in refining content to ensure accuracy, clarity, and consistency for digital platforms. His work reflects a commitment to responsible journalism and audience-focused reporting.