জাওয়াদ তাহের : দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর ঈদের দিন সকালে সিয়াম পালনকারীরা যেভাবে নিজে খায় তেমনি দরিদ্রদের খাওয়ানোর জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আর ইসলামে যে অর্থ দিয়ে সাহায্য করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, এই দানকে শরিয়তের পরিভাষায় সদকাতুল ফিতর বলে। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) সদকাতুল ফিতর রোজাকে বেহুদা ও অশ্লীল কথাবার্তা ও আচরণ থেকে পবিত্র করার উদ্দেশ্যে এবং মিসকিনদের খাদ্যের ব্যবস্থার জন্য ফরজ করেছেন। যে ব্যক্তি তা (ঈদুল ফিতরের) নামাজের পরে পরিশোধ করে তা অন্যান্য সাধারণ দান-খয়রাতের অনুরূপ হিসাবে গণ্য।

Fitor

Advertisement

(সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ১৬০৯)
বস্তুত এক মাস রোজা রাখতে গিয়ে আমাদের ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় যেসব ছোট ভুলত্রুটি হয়েছে তার ক্ষতিপূরণ হিসেবেই সদকাতুল ফিতর।

সদকাতুল ফিতর কার ওপর ওয়াজিব

প্রত্যেক মুসলমান নর-নারী, যার হাতে ঈদের দিন সুবহে সাদিকের সময় জীবিকা নির্বাহের জন্য প্রয়োজনীয় বস্তু ব্যতীত অতিরিক্ত নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকে তার ওপর সদকাতুল ফিতর ওয়াজিব।

সদকাতুল ফিতর কে আদায় করবে

সদকাতুল ফিতর নিজের পক্ষ থেকে এবং তার অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের পক্ষ থেকে আদায় করা ওয়াজিব। নিজের স্ত্রী ও প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের পক্ষ থেকে স্বামী ও বাবার জন্য সদকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব নয়, তারা নিসাব পরিমাণ মালের মালিক হলে নিজেরাই তাদেরটা আদায় করবে।

তবে স্বামী ও বাবা যদি তাদের পক্ষ থেকে আদায় করে দেয়, তাহলে সদকাতুল ফিতর আদায় হয়ে যাবে।
সদকাতুল ফিতর কাকে দেবে

জাকাত গ্রহণের উপযুক্ত যেকোনো গরিব মুসলমানকে সদকাতুল ফিতর দেবে। যদি আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে কেউ জাকাত গ্রহণের উপযুক্ত হয়, তাহলে অন্যদের তুলনায় তাদের দেওয়াই উত্তম। তাই ভাই-বোন, চাচা-ভাতিজা, মামা, খালা, ফুফু এদেরকে দেওয়া যাবে।

তবে নিজ পিতামাতার দাদা-দাদি, নানা-নানি প্রমুখ ব্যক্তি, তেমনি নিজের ছেলেমেয়ে, নাতি-নাতনি এবং তাদের অধীনস্তকে সদকাতুল ফিতর দেওয়া যাবে না।
সদকাতুল ফিতর কখন আদায় করবেন

ঈদের আগেই সদকাতুল ফিতর আদায় করে দেওয়া উত্তম। আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত যে নবী (সা.) লোকদের ঈদের নামাজের উদ্দেশে বের হওয়ার আগেই সদকাতুল ফিতর আদায় করার নির্দেশ দেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৪২১)

তাই সদকাতুল ফিতর রমজানের শেষ দিকে আদায় করা উচিত। কারণ এতে গরিব মানুষের ঈদের প্রয়োজন পূরণে সহায়ক হবে।

(আল-বাহরুর রায়েক : ২/২৫৫)

ঈদের আগে আদায় করতে না পারলে

সদকাতুল ফিতর আদায় করা আবশ্যক। যথাসময়ে কেউ যদি কোনো কারণে আদায় করতে না পারে, তাহলে ঈদের পরে হলেও যথাসম্ভব দ্রুত আদায় করে দিতে হবে। আর ভবিষ্যতে যেন এমন না হয় এ ব্যাপারে সচেষ্ট থাকবে।

জাকাত ফরজ না হলে ফিতরা আদায় করতে হয় না?

আমাদের অনেকের ধারণা, যদি কারো ওপর জাকাত ফরজ না হয় তাহলে তার ওপর সদকাতুল ফিতর ওয়াজিব হয় না। অথচ এমন ধারণা ঠিক নয়। কোনো লোকের ওপর জাকাত ফরজ না হলেও সদকাতুল ফিতর আবশ্যক হয়। কারণ জাকাত ও সদকাতুল ফিতরের নিসাবের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। জাকাত শুধু তিন প্রকারের সম্পদের ওপর ফরজ হয়। জাকাত শুধু সোনা-রুপা, টাকা-পয়সা এবং ব্যবসায় পণ্যের ওপরই ফরজ হয়।

আর সদকাতুল ফিতর প্রয়োজন অতিরিক্ত সব ধরনের সম্পদের ওপর ওয়াজিব হয়। বসবাসের অতিরিক্ত ঘরবাড়ি, প্রয়োজন অতিরিক্ত গাড়ি, ঘরের অপ্রয়োজনীয় আসবাব ইত্যাদি সদকাতুল ফিতরের নিসাবের আওতায় আসে। তাই এমন ধারণা ঠিক নয় যে জাকাত ফরজ না হলে সদকাতুল ফিতর ওয়াজিব হয় না।

রোজা না রাখলে ফিতরা আদায় করতে হয়?

শরিয়ত কর্তৃক কোনো ওজরের কারণে কেউ যদি রোজা রাখতে না পারে, তাহলে তার সদকাতুল ফিতর আদায় করতে হয় না, এমনটা অনেকেই ধারণা করেন। এই ধারণাও সম্পূর্ণ ভুল। কারণ সদকাতুল ফিতর স্বতন্ত্র একটি ইবাদত। ওজরের কারণে রোজা রাখতে না পারলে সে যদি নিসাব পরিমাণ মালের মালিক হয়, তাহলে তাকেও সদকাতুল ফিতর আদায় করতে হবে।

প্রবাসীদের সদকাতুল ফিতর

আমাদের দেশের যেসব ভাই প্রবাসে থাকেন তাঁরা যদি নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হন, তাহলে তাঁরা কোন দেশে সদকাতুল ফিতর আদায় করবেন! এর জবাব হচ্ছে, তিনি যেকোনো দেশে চাইলে আদায় করতে পারবেন। নিজ দেশে তাঁর প্রতিনিধি যদি তাঁর পক্ষ থেকে আদায় করে তাহলে আদায় হয়ে যাবে।

এ ক্ষেত্রে যে বিষয়টি সামনে আসে তা হচ্ছে, এমন ব্যক্তি কোন দেশের দ্রব্যমূল্য হিসাবে সদকাতুল ফিতর আদায় করবেন? তিনি যে দেশে অবস্থান করছেন সে দেশ হিসেবে, না তার স্বদেশ হিসাবে?

এর জবাব হচ্ছে, এ ক্ষেত্রে বিধান হচ্ছে সদকাতুল ফিতর যিনি আদায় করবেন যে দেশে অবস্থান করছেন সেই দেশের খাদ্যদ্রব্যের মূল্য হিসেবেই আদায় করবেন। কেউ যদি সৌদিপ্রবাসী হন তাহলে সৌদি আরবের খাদ্য মূল্য অনুযায়ী তাঁকে সদকাতুল ফিতর আদায় করতে হবে। তাই সৌদি আরবে বসবাসকারী কোনো ভাই যদি বাংলাদেশে সদকাতুল ফিতর আদায় করতে চান, তাহলে সৌদি আরবের হিসাব অনুযায়ী আদায় করতে হবে, বাংলাদেশের হিসাব অনুযায়ী নয়। আমাদের সমাজে অনেকেই এ ক্ষেত্রে ভুল করে থাকেন।

তেমনি বিদেশে অবস্থানরত কোনো ব্যক্তি যদি তাঁর অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের পক্ষ থেকে ফিতরা দেশে আদায় করতে চান তাহলেও বিদেশের হিসাব অনুযায়ী আদায় করতে হবে, দেশের হিসাবে নয়। কারণ নাবালেগ সন্তানের সদকাতুল ফিতর আদায় করা পিতার ওপর আবশ্যক। আর শরিয়তে ফিতরা আদায়ের ক্ষেত্রে যার ওপর আবশ্যক সে যে স্থানে অবস্থান করছে সেখানকার দ্রব্যমূল্য ধরে আদায় করতে হবে, যাদের পক্ষ থেকে আদায় করা হচ্ছে তাদের অবস্থান ধর্তব্য নয়।

তবে দেশে অবস্থানরত নিজ স্ত্রী ও প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের পক্ষ থেকে যদি সদকাতুল ফিতর আদায় করতে চায়, তাহলে দেশের হিসাবে আদায় করবে। কারণ স্ত্রী ও বালেগ সন্তানের সদকাতুল ফিতর তাদের নিজের ওপর আবশ্যক হয়, স্বামী বা বাবার ওপর নয়। তাই তাদের ফিতরা স্বামী বা বাবা আদায় করলে মূলত আদায়কারী তারা নিজেরাই। এ জন্য তাদের অবস্থানস্থলের দ্রব্যমূল্য হিসাবে সদকাতুল ফিতর আদায় করতে হবে।

পেঁয়াজে কালো ছোপ কীসের ইঙ্গিত বহন করে? জানলে চমকে যাবেন

বিদেশের অবস্থানরত কোনো প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের পক্ষ থেকে বাবা যদি দেশে নিজ সম্পদ দ্বারা সদকাতুল ফিতর আদায় করেন, তাহলে বিদেশের হিসাব অনুযায়ী আদায় করতে হবে। (রদ্দুল মুহতার : ২/৩৫৫)

সূত্র : কালেরকণ্ঠ।

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Shamim Reza is an experienced journalist and sub-editor at Zoom Bangla News, with over 13 years of professional experience in the field of journalism. Known for his strong writing skills and editorial insight, he contributes to producing accurate, engaging, and well-structured news content. Born and brought up in Jashore, his background and experience shape his deep understanding of social and regional perspectives in news reporting.